চীনে চার শতাধিক ডাইনোসরের পায়ের ছাপ পাওয়া গেছে। ইউননান প্রদেশের চুসিয়ং ই স্বায়ত্তশাসিত প্রিফেকচারে পাওয়া ছাপগুলো প্রায় ১২ কোটি বছর আগের ক্রিটেসিয়াস যুগের বলে জানিয়েছেন চীনা প্রত্নতাত্ত্বিকরা। চীনের সংবাদমাধ্যম সিসিটিভি এ খবর জানিয়েছে।
গবেষকরা বলছেন, ছাপগুলো থেকে বোঝা যাচ্ছে যে ক্রিটেসিয়াস যুগে লুফেং এলাকায় বিভিন্ন প্রজাতির ডাইনোসরের ব্যাপক উপস্থিতি ছিল।
মে মাসের শুরুর দিকে দুই স্থানীয় গ্রামবাসী ছাপগুলো আবিষ্কার করে প্রশাসনকে জানান। লুফেং শহরের কংলংশান টাউনের পাহাড়ে পাওয়া গেছে পায়ের ছাপগুলো। জায়গাটির শিলাস্তর পরীক্ষায় দেখা গেছে ছাপগুলো প্রায় ১২ কোটি বছরের পুরোনো। কংলংশান টাউনের বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘ডাইনোসর পর্বত’।
ডাইনোসর ফসিল প্রটেকশন ও গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান ওয়াং তাও জানান, ছাপগুলোকে তারা তিন শ্রেণিতে ভাগ করেছেন। এগুলোর কিছু টি-রেক্সের, আবার কোনোটি স্টেগোসর প্রজাতির।
ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহীম রইসি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির-আব্দুল্লাহিয়ানসহ বিধ্বস্ত হেলিকপ্টারের থাকা সব কর্মকর্তারা মারা গেছেন। দেশটির আধা সরকারি নিউজ এজেন্সি মেহের নিউজ এ খবর দিয়েছে।
ইরানি সংবাদমাধ্যমটির বরাত আল জাজিরা জানিয়েছে, বিধ্বস্ত হেলিকপ্টারে ছিলেন পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের গভর্নর মালেক রহমাতিও। যদিও প্রেসিডেন্টের মৃত্যুর বিষয়টি এখনো পর্যন্ত নিশ্চিত করেননি দেশটির সরকারি কর্মকর্তারা। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইরানের এক শীর্ষ কর্মকর্তা রয়টার্সকে প্রেসিডেন্ট রাইসিসহ হেলিকপ্টারে থাকা কর্মকর্তাদের মৃত্যুর সংবাদ নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে চিকিৎসকরাও দুর্ঘটনাস্থলে প্রাণের কোনো অস্তিত্ব পাননি বলে জানিয়েছেন।
এর আগে রোববার আজারবাইজানের সীমান্তবর্তী এলাকায় দুই দেশের যৌথভাবে নির্মিত একটি বাঁধ উদ্বোধন করতে যান ইব্রাহিম রাইসি। সেখানে আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভও ছিলেন। সেখান থেকে তিনটি হেলিকপ্টারের বহর নিয়ে ইরানের পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের রাজধানী তাবরিজে ফিরছিলেন ইব্রাহিম রাইসি ও তার সঙ্গে থাকা অন্য কর্মকর্তারা।
সোমবার আল জাজিরার খবরে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির হেলিকপ্টার দুর্ঘটনার মুখে পড়ার পর সেখানে কারও জীবিত থাকার ‘কোনো চিহ্ন’ নেই বলে ইরানের রাষ্ট্রীয় টিভি বলছে।
অন্যদিকে ইরানের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে রয়টার্স আরও জানিয়েছে, দুর্ঘটনায় হেলিকপ্টারটি ‘সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে’।
পথে পূর্ব আজারবাইজানের জোলফা এলাকার কাছে দুর্গম পাহাড়ে প্রেসিডেন্টকে বহনকারী হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হয়। তবে অন্য দুটি হেলিকপ্টার নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছায়।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে গাড়ি চালিয়ে বেশ ভালোই কাটছিল নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের বাসিন্দা জাকির হোসেনের দিনকাল। আরো নির্ভার, স্বচ্ছন্দ জীবনের আশায় স্বপ্ন বোনেন ইতালি যাওয়ার। এক বন্ধুর মাধ্যমে ইতালির ভিসা প্রক্রিয়া শুরু করেন। গ্রামের বাড়িতে জমি বিক্রি করে ১৩ লাখ টাকায় নুলস্তা (ওয়ার্ক পারমিট) হাতে পান।
ভিসা আবেদন করতে ফিরে আসেন দেশে। এ পর্যন্ত সব ঠিক ছিল। বিপত্তির শুরু ভিসার দীর্ঘসূত্রতায়। নিয়ম অনুযায়ী, তিন মাসের মধ্যে ইতালির ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া নিষ্পত্তি করতে হয়।
কিন্তু জাকিরের অপেক্ষা ফুরায় না ৯ মাসেও। এর মধ্যে ইউএইর ভিসার মেয়াদও শেষ। ইতালির ভিসাও যদি না পান, তাহলে পরিবার নিয়ে পথে নামতে হবে তাঁকে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে জাকির বলেন, ‘আমার জমিজমা বিক্রি করে দিয়েছি।
দুবাইয়ের ভিসাও শেষ। এখন আমার সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই। আমার সবই শেষ।’
শুধু জাকির হোসেন নন, এমন লাখো ইতালি গমনেচ্ছু মানুষের ঘরে ঘরে এখন শুধুই কান্না, হতাশা আর হাহাকার। গত ২৭ মার্চ ঢাকাস্থ ইতালিয়ান রাষ্ট্রদূতের দেওয়া তথ্য মতে, ২০২২ সালের আগস্ট থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে এক লাখ ১১ হাজার বাংলাদেশি ভিসাপ্রার্থীর পাসপোর্ট।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ভিসা প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান ভিএফএস গ্লোবালের অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে এই দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি হয়েছে। এভাবে ভিএফএসের কাছে জিম্মি হয়ে অত্যন্ত মানবেতর জীবন যাপন করছে এক লাখের বেশি ভিসাপ্রত্যাশী ও তাঁদের পরিবার।
এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিপুলসংখ্যক ভিসাপ্রত্যাশী এরই মধ্যে বিপুল অর্থ ইতালিতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। এক হিসাবে জানা গেছে, শুধু নুলস্তা পেতেই এক লাখ ১১ হাজার ভিসাপ্রার্থীর কাছ থেকে ইতালিতে চলে গেছে প্রায় ৮০ কোটি ডলার। এমনকি দীর্ঘ ১৬ মাস ধরে ইতালির ভিসার প্রত্যাশায় ঘুরে ঘুরে দিন কাটছে তাঁদের। ফলে তাঁদের উপার্জনও থমকে গেছে। সাধারণত ইতালি গমনেচ্ছু ব্যক্তিদের মধ্যে ৬০ শতাংশ কৃষি ভিসার আবেদন করে থাকেন। বাকি ৪০ শতাংশ স্পন্সর ভিসার। কৃষি খাতে ভিসার জন্য ১৪ লাখ টাকা এবং স্পন্সর ভিসার জন্য ১৯ লাখ টাকা লাগে। তবে নুলস্তা পেতে সংশ্লিষ্ট কম্পানিতে ৫০ শতাংশ টাকা জমা দিতে হয়। সে হিসাবে এরই মধ্যে নুলস্তা পেতে ইতালিতে চলে গেছে প্রায় ৮০ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় আট হাজার ৮৮০ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১১০ টাকা হিসাবে)। এ ছাড়া ভিএফএসে অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাবদ এসব কর্মীর খরচ হয়েছে অন্তত ২২০ কোটি টাকা। এ ছাড়া অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে আরো কমপক্ষে এক হাজার কোটি টাকা দালালদের পকেটে ঢুকেছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। এভাবে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ইতালিতে চলে গেলেও দেশে পড়ে আছেন হতভাগ্য ভিসাপ্রার্থীরা।
জানা গেছে, চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ভিসার জন্য পাসপোর্ট জমা পড়েছে আরো ৯ হাজার ৬০০টি। ফলে ইতালিতে কর্মী পাঠানো ছাড়াই নুলস্তা বাবদ আরো বিপুল অর্থ চলে গেছে। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে আলাপেও জানা গেছে, কেউ কেউ অর্ধেকের বেশি টাকা এরই মধ্যে ইতালিতে সংশ্লিষ্ট কম্পানি এবং আইনি পরামর্শ প্রতিষ্ঠানে পরিশোধ করে রেখেছেন।
ঢাকাস্থ ইতালিয়ান দূতাবাসের সূত্র মতে, ২০২২ সালের ৩৫ হাজার ও ২০২৩ সালের ৭৬ হাজার নিয়ে মোট এক লাখ ১১ হাজার পাসপোর্ট জমা নেয় ভিএফএস গ্লোবাল। গত ২৭ মার্চ ভিসাপ্রার্থীদের মানববন্ধনের পর ইতালিয়ান রাষ্ট্রদূত অ্যান্তোনিও আলেসান্দ্রোর দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে আটকে থাকা পাসপোর্ট বিতরণের আশ্বাস দেন। এর পরও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি দেখা যায়নি। উল্টো দিন দিন বড় হচ্ছে আটকে থাকা পাসপোর্টের সংখ্যা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি মাসের শুরু থেকে প্রতিদিন ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে ভিএফএসের মাধ্যমে সব মিলে ২৫০ থেকে ৩০০টি ভিসা আবেদন জমা নেওয়া হচ্ছে। বিপরীতে ভিসা নিষ্পত্তির পর পাসপোর্ট বিতরণ করা হচ্ছে মাত্র ৫০ থেকে ১৫০টি।
অভিবাসন খাতের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, নুলস্তার সত্যতা যাচাইয়ের কারণে দীর্ঘসূত্রতার দোহাই দেওয়া হলেও মূলত কাজটি খুবই সহজ। এটি যাচাই করা মাত্র ৩০ সেকেন্ডের ব্যাপার। এর জন্য সাত থেকে আট মাস বা এক বছর সময় লাগাটা অযৌক্তিক। এর ফলে বৈধ পথ ছেড়ে অবৈধ পথেই পা বাড়াচ্ছেন ইতালি গমনেচ্ছু কর্মীরা। এর দায় ভিএফএস গ্লোবাল এড়াতে পারে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘ভিএফএস গ্লোবালের অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয় আমাদের নজরে এসেছে। আমরা বিষয়টি তদন্ত করছি। খুব দ্রুত এগুলোর সমাধান হবে।’ বিদেশগামী কর্মীদের বিষয়ে মন্ত্রণালয় জোরালোভাবে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
ইউরোপের শ্রমবাজারে ভিসা প্রক্রিয়ার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ভিএফএস গ্লোবাল। বাংলাদেশসহ ১৪৭টি দেশে তারা ভিসা প্রক্রিয়ার কাজ করে থাকে। বাংলাদেশের ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে তারা তাদের সার্ভিস দিয়ে থাকে। তবে ঢাকা বাদে বাকি দুই জেলায় শুধু প্রিমিয়াম সার্ভিস দেয় ভিএফএস গ্লোবাল। ঢাকায় প্রিমিয়াম সার্ভিসের পাশাপাশি সাধারণ সার্ভিসও চালু রয়েছে। তবে প্রিমিয়াম সার্ভিসের নামে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে সংস্থাটি। প্রতিবেশী দেশ ভারত প্রিমিয়াম সার্ভিসে যে সেবা দিচ্ছে, তার থেকে অনেক অনুন্নত সেবা দিয়েই কর্মীপ্রতি তিন হাজার ৮৯৯ টাকা বেশি নিচ্ছে ভিএফএস, যা বছরে গিয়ে দাঁড়ায় সাত কোটি ২০ লাখ ৫৩ হাজার ৫২০ টাকা।
ভিসার আশায় মাসের পর মাস অপেক্ষায় থাকা ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, ঠিক কী কারণে ভিসা পেতে এই দীর্ঘসূত্রতা? এর উত্তর খুঁজতে অনুসন্ধান করা হয়। এতে উঠে আসে দালালচক্রের সঙ্গে যোগসাজশে ভিএফএসের অনিয়ম-দুর্নীতির ভয়াবহতা। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভিসা আবেদনের জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতেও কর্মীপ্রতি গুনতে হয় লাখ টাকা।
অনুসন্ধান করতে গিয়ে সামনে আসে একটি নথি। এতে দেখা যায়, ২০২৩ সালের ২১ আগস্ট রাত ১২টা ৪৯ মিনিট থেকে রাত দেড়টা পর্যন্ত স্লট ওপেন করে ৭৮টি অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুকিং দেওয়া হয়। ভিএফএসের ব্যবস্থাপক সাবিকুন্নাহারের ইউজার আইডি (ভিএফএস গ্লোবাল সাবিকুন্নাহ) ব্যবহার করা হয়। এমনকি সব অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেওয়া হয় একই আইপি অ্যাড্রেস (১০.১৫০.১০০.১৯) থেকে। এই অ্যাপয়েন্টমেন্টের একটি শিটও হাতে এসে পৌঁছেছে। এখানে দেখা যায়, ‘এন্ট্রি নেম’-এর জায়গায় কোনো কর্মীর নাম নেই। সব জায়গায় লেখা ‘এলোকেশন ফর সেন্টার’। এমনকি ‘এন্ট্রি কলাম নেম’-এর জায়গায় ‘টোটাল সিটস’ লেখা রয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাধারণত সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টার মধ্যে অর্থাৎ অফিস চলাকালে স্লট ওপেন করা হয়ে থাকে। মধ্যরাতে স্লট খোলার বিষয়টি অস্বাভাবিক। এতে অ্যাপয়েন্টমেন্ট জালিয়াতিতে ভিএফএসের যুক্ত থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ভিএফএসের অনিয়মের এখানেই শেষ নয়। সাধারণত চট্টগ্রাম কার্যালয়ে দিনে ২০ জনের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। গত ৬ মে অতিরিক্ত ২০ জন ভিসাপ্রত্যাশী ভিএফএস চিটাগংয়ের অসংগতিপূর্ণ তথ্য সংবলিত মেসেজ পান, নিয়ম ভেঙে তাঁরাও একই দিনে অ্যাপয়েন্টমেন্টের সুযোগ পান।
অনুসন্ধান বলছে, ভিসাপ্রার্থীদের অনলাইনে আবেদনের পথেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রেখেছে ভিএফএস। একজন ভিসাপ্রার্থীকে নুলস্তা পাওয়ার পর পাসপোর্ট জমা দিতে অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য অনলাইনের মাধ্যমে ভিএফএসের কাছে আবেদন করতে হয়। এ সময় আবেদনকারীর মোবাইল ফোনে একটি ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি) আসে, যার মেয়াদ থাকে তিন মিনিট। ভুক্তভোগীরা বলেছেন, তাঁদের ফোনে এই ওটিপি আসতে ৯ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত লেগে যায়। ততক্ষণে আবেদনের প্রক্রিয়াটি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। অথচ দালালের মাধ্যমে আবেদনে ওটিপির দরকার পড়ে না।
গত ১২ মে বিকেল ৩টায় ছদ্মবেশে আবেদনকারী সেজে রাজধানীর গুলশান ১ নম্বরে নাফি টাওয়ারে অবস্থিত ভিএফএস গ্লোবালের কার্যালয়ের সামনে যায় অনুসন্ধানী দল। কিছুক্ষণ অবস্থান করতেই দেখা মেলে ওয়াহাব শিকদার নামের এক দালালের। জানতে চান অ্যাপয়েন্টমেন্ট লাগবে কি না। হ্যাঁ-সূচক জবাব দিতেই তিনি নিয়ে যান জমাদ্দার ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস নামের একটি অফিসের নিচে। সেখানে তিনি পরিচয় করিয়ে দেন তাঁর বস মামুন শেখের সঙ্গে।
অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে কী করতে হবে জানতে চাইলে মামুন শেখ নিজ থেকেই একে একে বলতে থাকেন করণীয় কী। তিনি এ সময় বলেন, ‘নুলস্তা যদি সঠিক হয় তাহলে আপনারা ডেট পাবেন। আমি আপনাকে বলি, মেইল করতে পয়সা লাগে না। কিন্তু আপনার প্রক্রিয়া জানতে হইব। লোক থাকতে হইব। আমরা ২৫ হাজার টাকা নিই। প্রথম যেদিন অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেব সেদিন আমরা পাঁচ হাজার টাকা নেব। বাকি ২০ হাজার টাকা আমরা পরে নিই। টাইম আমার ১৫ দিনও লাগে ২০ দিনও লাগে। কিন্তু আমরা ১০০ শতাংশ পাই।’ মামুন যে এরই মধ্যে অর্থের বিনিময়ে অনেককে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাইয়ে দিয়েছেন, এর কয়েকটি নমুনাও দেখালেন।
ভিসার আশায় ঘরে ঘরে হাহাকার
ইতালিসহ ইউরোপের দেশগুলোতে প্রবেশ করতে গিয়ে ভূমধ্যসাগরে ডুবে মারা যাচ্ছেন বহু অভিবাসনপ্রত্যাশী। এ তালিকায় অন্যতম অবস্থান বাংলাদেশের। সর্বশেষ ১৪ ফেব্রুয়ারি সমুদ্রে ডুবে মারা যান আটজন বাংলাদেশি। সমুদ্রপথে অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে ‘ডিক্রেটো ফ্লুসি’র অধীনে বিপুলসংখ্যক কর্মী নিচ্ছে ইতালি। ইতালিতে সাধারণত বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা অনেক বেশি। বৈধ পথে সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় অনেকের মনে আশার সঞ্চার হলেও ভিএফএসের কাছে জিম্মি হয়ে লাখো কর্মী এখন হতাশায় নিমজ্জিত। ফলে অনেকে আবার পা বাড়াচ্ছেন অবৈধ পথে।
১৩ মে সরেজমিনে গেলে ভিএফএস গ্লোবাল কার্যালয়ের সামনে কথা হয় সৌদিপ্রবাসী মানিকগঞ্জের সিংগাইয়ের বাসিন্দা শাহিন খানের সঙ্গে। ১০ লাখ টাকা জমা দিয়ে নুলস্তা পেয়েছিলেন। এরপর ভিসা পেতে সৌদি থেকে দেশে ফিরে গত বছরের ৮ অক্টোবর পাসপোর্ট জমা দেন ভিএফএসে। কদিন পর পর খোঁজ নিতে আসেন। এদিনও তিনি হতাশ হয়ে বের হন ভেতর থেকে।
শাহিন খান বলেন, ‘৯ মাসেও পাসপোর্ট ফেরত পাইনি। সামনের মাস পর্যন্ত সৌদি আরবের ভিসা রয়েছে। এখন যদি আমার ভিসা না দিয়ে পাসপোর্ট ফেরত দেয় তা-ও সৌদি যেতে পারব। নইলে দুই কুলই হারাতে হবে। পাসপোর্টের আশায় এ পর্যন্ত অনেকবার এসেছি। তাদের কাছে এলে বলে—আমরা আপনাকে জানাব, তখন আসবেন। এখন কবে যে জানাবে সেটাই তো বলে না। আগামী মাসের ৬ তারিখের আগে যদি আমি পাসপোর্ট ফেরত না পাই, তাহলে আমার সব দিক শেষ হয়ে যাবে।’
দিনভর সেখানে অবস্থান করে আরো কয়েকজন ভুক্তভোগীর দেখা পায় । তাঁদের মধ্যে আছেন সিংগাইরের আরেক ভুক্তভোগী মো. শরিফ। তিনি বলেন, ‘আমি ইতালি যাব বলে এখন কোনো কাজে যুক্ত হতে পারছি না। ৯ মাস ধরে আমার পাসপোর্ট আটকে রয়েছে। হয় আমাদের ভিসা দিক, না হয় পাসপোর্টগুলো ফেরত দিয়ে দিক। পাসপোর্ট ফেরত দিলেও আমরা অন্য দেশে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করতে পারি। এখন তো কোনো কিছুই করতে পারছি না।’
শরীয়তপুরের বাসিন্দা মাসফিক জামান বলেন, ‘আমরা এলে শুধু বলে, পাসপোর্ট ফেরতের মেসেজ যেদিন আসবে সেদিন আসবেন। আমাদেরকে ভেতরে ঢুকতেই দেয় না। কবে যে পাসপোর্ট ফেরত পাব তারও কোনো ধরনের তথ্য তারা দিচ্ছে না। আমরা না যেতে পারছি ইতালি, না দেশে কিছু করতে পারছি। সব জায়গায় টাকা-পয়সা দিয়ে আমরা বসে আছি।’
দুবাইফেরত নোয়াখালীর জাকির হোসেন জানান, দালালকে টাকা দিয়েও পাসপোর্ট ফেরত পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, ‘অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার সময় এক দালালকে ৫০ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। এখন সে ইতালি চলে গেছে। আমার পরিচিত একজন ২০ হাজার টাকা দিয়ে পাসপোর্ট বের করতে পেরেছে। কিন্তু সে আমাকে সেই দালালের পরিচয় দিচ্ছে না। আমি জমি বিক্রি করে ১৩ লাখ টাকা দিয়ে নুলস্তা নিয়েছি। ভিসা না পেলে আমার সব শেষ হয়ে যাবে।’
ভিএফএসের প্রিমিয়াম সার্ভিসের নামে বছরে লোপাট ৭ কোটি টাকা
ভিএফএস গ্লোবালে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভিসা প্রসেসিং বাবদ সাধারণ সার্ভিসে ১৭ হাজার ৯৮০ টাকা এবং প্রিমিয়াম সার্ভিসে ২২ হাজার ৩১৮ টাকা নিয়ে থাকে। প্রিমিয়াম সার্ভিসে কর্মীর কাগজপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পাশাপাশি ছবি তোলা এবং ফরম পূরণ করে দেওয়া হয়। সঙ্গে একটি মাফিন কেক, লেক্সাস বিস্কুট ও ফ্রুটিকা জুস দিয়ে আপ্যায়ন। প্রতিবেশী দেশ ভারতে প্রিমিয়াম সার্ভিসের মধ্যে একটি বড় সার্ভিস হলো হোম ডেলিভারি। অর্থাৎ কেউ যদি বাসা থেকে তার কাগজপত্র ভিএফএস গ্লোবালে পাঠিয়ে দিতে চায় এবং তার পাসপোর্ট বাসায় দিয়ে যাবে এই সার্ভিস নিতে চায়, তবে সে এই সার্ভিসটি নিতে পারবে।
সেবার মানে বড় ফারাক থাকার পরও ভারতের চেয়ে কর্মীপ্রতি তিন হাজার ৮৯৯ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে বাংলাদেশে। দেশে প্রতিদিন তিনটি শহরে ৭০ জনকে প্রিমিয়াম সার্ভিস দিয়ে থাকে ভিএফএস গ্লোবাল। মাসে ২২ দিন তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এ থেকে দেখা যায়, প্রিমিয়াম সার্ভিসের নামে প্রতিদিন দুই লাখ ৭২ হাজার ৯৩০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে, যা প্রতি মাসে গিয়ে দাঁড়ায় ৬০ লাখ চার হাজার ৪৬০ টাকা এবং বছরে সাত কোটি ২০ লাখ ৫৩ হাজার ৫২০ টাকা।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভিসাপ্রত্যাশীদের সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য সরবরাহ করে না ভিএফএস। অ্যাপয়েন্টমেন্ট কবে পাবেন, তাঁদের পাসপোর্ট এত দিন আটকে রাখার কারণ, আদৌ ভিসা সরবরাহ করা হবে কি না—এসব বিষয়ে ভিসাপ্রত্যাশীদের কিছুই অবগত করে না সংস্থাটি। এমনকি ভিএফএসের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য খুদে বার্তা ছাড়া আর কোনো মাধ্যমও নেই। ফলে মাসের পর মাস এমন দোটানায় পড়ে নাজেহাল হয় আবেদনকারী বা তাঁর পরিবার।
সেবার ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে আরো তারতম্য লক্ষ করা গেছে। ভিএফএস গ্লোবাল ভারত ও বাংলাদেশের ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখা যায়, বাংলাদেশে ছয় মাসের মধ্যে নুলস্তার মেয়াদ থাকলে ভিএফএস গ্লোবালে আবেদন করতে পারে। তবে ভারতে নুলস্তার মেয়াদ ১৫ দিনের বেশি হয়ে গেলে তারা সরাসরি ভিএফএস গ্লোবালের অফিসে যোগাযোগ করতে পারে। সে সময় তাদের আবেদন গ্রহণ করা হয়। ভারতে ভিএফএস গ্লোবালের ডাইনামিক ডিজিটাল ভেরিফিকেশন নামের একটি সফটওয়্যার রয়েছে। এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে আবেদনকারীরা তাঁদের ভিসা কার্যক্রমের কাগজপত্রে কোনো ভুল-ত্রুটি থাকলে তা ভিসা প্রক্রিয়ার মধ্যে ঠিক করে ফেলতে পারেন। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত এই সফটওয়্যার আনা হয়নি। ভারতে একজন কর্মীর ভিসা প্রক্রিয়া হতে সময় নির্ধারণ করা হয় ৯০ দিন, অর্থাৎ তিন মাস। আর বাংলাদেশে ভিসা প্রক্রিয়ায় সময় নির্ধারণ করা হয় ১২০ দিন, অর্থাৎ চার মাস।
এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে কথা বলতে ভিএফএস কার্যালয়ে গেলে কোনো কর্মকর্তা কথা বলতে রাজি হননি। একাধিকবার চেষ্টার পর ফোনে পাওয়া যায় ভিএফএস গ্লোবালের বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর শান্তনু ভট্টাচার্যকে। মধ্যরাতে অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট চালু করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, ‘এ রকম স্লট ওপেনই হয়নি। এই তথ্য সঠিক নয়। স্লট কখনোই ম্যানুয়ালি ওপেন হয় না।’
চট্টগ্রামে অতিরিক্ত ২০ জনের অ্যাপয়েন্টের বিষয়টি অবগত করলে তিনি বলেন, ‘এভাবে বললে তো হয় না।’ এরপর এ বিষয়ে কথা বলতে আপত্তি জানান তিনি। তবে তিনি এ বিষয়ে সরাসরি অফিসে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
জানতে চাইলে অভিবাসন গবেষণা প্রতিষ্ঠান রামরুর চেয়ারপারসন ড. তাসনীম সিদ্দিকী বলেন, ‘যাঁরা অনিয়মের পথ ধরে যাচ্ছেন তাঁরা ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে দালালকে অর্থ দিয়ে চলে যাচ্ছেন। কিন্তু যাঁরা বৈধভাবে ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে ইতালি যেতে চান, তাঁদের জন্য যে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করা হচ্ছে তা বৈধ পথের অভিবাসনের একটি বড় অন্তরায়। এ ক্ষেত্রে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সরকার বিএমইটির মাধ্যমে এ বিষয়ে তদন্ত করে দ্রুত সমাধান বের করতে পারে। আমাদের আইনি ব্যবস্থা আছে। সেটার প্রয়োগ করতে হবে। সরকার চাইলে অবশ্যই এর প্রতিকার আসবে।’ সূত্র: কালের কণ্ঠ
একটি বিড়ালকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ‘ডক্টরেট’ ডিগ্রিতে ভূষিত করা হয়েছে।
বিড়ালটির নাম ম্যাক্স এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভারমন্ট অঙ্গরাজ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাকে এ ডিগ্রি দেওয়া হয়। খবর এপির।
রোববার এক প্রতিবেদনে বলা হয়- অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের রিপোর্ট অনুসারে, ম্যাক্স নামের ওই বিড়ালটিকে ইঁদুর শিকার বা ঘুমানোর কৃতিত্বের জন্য নয় বরং ভারমন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটির ক্যাসেলটন ক্যাম্পাস তাকে এ সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি দিয়েছে তার বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের স্বীকৃতির জন্য।
ভারমন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটির ক্যাসেলটন ক্যাম্পাস এক ফেসবুক পোস্টে বলেছে, ম্যাক্স বছরের পর বছর ধরে ক্যাসেলটন পরিবারের একজন স্নেহময় সদস্য।
ভারমন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের প্রবেশদ্বারের রাস্তায় পাশেই বাস করে এক পরিবার। সেই পরিবারই এই বিড়ালটির মালিক।
বিড়ালের মালিক অ্যাশলে ডাও বলেন, বিড়ালটি নিজেই ঠিক করেছিল সে ক্যাম্পাসে যাবে। এরপর থেকেই সে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আড্ডা দিতে শুরু করে, আর শিক্ষার্থীরাও তাকে ভালোবাসতে শুরু করে।
ম্যাক্স নামের ওই বিড়ালটি গত প্রায় চার বছর ধরে ক্যাম্পাসের অংশ হয়ে রয়েছে এবং শিক্ষার্থীরা যখনই তাকে তাদের পথের ধারে বিড়ালটিকে দেখতে পায় তখনই তারাও খুশি হয়। এমনকি শিক্ষার্থীরা আনন্দে ওই বিড়ালের সঙ্গে প্রায়ই ছবিও তোলে।
এমনকি সাবেক শিক্ষার্থীরাও যখনই ক্যাম্পাসে আসেন তখন তারাও বিড়ালটির খোঁজ নিতে তার মালিক ডাওয়ের কাছে যান।
অবশ্য ম্যাক্সের এই ডিগ্রিটি তার মালিক ডাওয়ের হাতে তুলে দেওয়া হবে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক অনুষ্ঠানে বিড়ালকে আমন্ত্রণ জানানোর পরিকল্পনা নেই ভারমন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটির।
সম্প্রতি ইউক্রেনের খারকিভ অঞ্চলে দেশটির সেনাদের হটিয়ে বেশ ভেতরে ঢুকেছে রুশ বাহিনী। দখল করে নিয়েছে বেশ কিছু এলাকা। এমন পরিস্থিতিতে তাদের রুখে দিতে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ইউক্রেনের সেনারা। তীব্র এই যুদ্ধের মধ্যে খারকিভে আসলে কী ঘটছে, তা দেখতে অঞ্চলটিতে গিয়েছেন বিবিসির প্রতিরক্ষাবিষয়ক সংবাদদাতা জোনাথন বেল। নিজ চোখে দেখা সব অভিজ্ঞতা পাঠকদের জন্য তুলে ধরেছেন তিনি।
ইউক্রেনের খারকিভ অঞ্চলের লিপৎসি গ্রামের দিকে দ্রতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছিলাম আমরা। গ্রামটি বর্তমানে অবরোধ করে রেখেছে রাশিয়ার সামরিক বাহিনী। গ্রামটি এ অঞ্চলের রাজধানী খারকিভ শহরের উত্তরে। ইউক্রেন বাহিনীকে হটিয়ে সীমান্তবর্তী এই এলাকায় প্রবেশ করেছেন রুশ সেনারা।
আমাদের সঙ্গে ছিলেন ইউক্রেনের ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যরা। লিপৎসি গ্রাম ঘিরে রাশিয়ার অগ্রগতি রুখে দিতে তাঁদের সেখানে পাঠানো হচ্ছে। এর আগে তাঁরা পূ্র্বে রুশ বাহিনীর সঙ্গে তীব্র লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এখন তাঁদের আরও উত্তরে সরিয়ে আনা হচ্ছে। কোনো বিশ্রাম ছাড়াই যুদ্ধ করে যাচ্ছেন এই সেনারা।
এই সেনাসদস্যদের যেখানে মোতায়েন করা হবে, সেখানে পৌঁছালাম আমরা। এর অবস্থান যুদ্ধের সম্মুখসারি থেকে মাত্র এক মাইল দূরে। আমাদের কানে ভেসে আসছিল কামানের গোলার শব্দ। জ্বলতে থাকা আগুনের কুণ্ডলী পেরিয়ে আমরা একটি বাংকারের দিকে দৌড় দিলাম। সেখানেই আমাদের আশ্রয় নিতে বলা হয়েছিল।
বাংকারের নিচে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে আলো-আঁধারির মধ্যে ইউক্রেনের একদল সেনাসদস্যকে দেখতে পেলাম। ড্রোন থেকে নেওয়া ভিডিও চিত্র খতিয়ে দেখছিলেন তাঁরা। তারপর সে অনুযায়ী কামান থেকে হামলা চালানোর নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। আন্দ্রি নামের একজন সেনাসদস্য বললেন, এই লড়াইয়ের মধ্যে কখন কী হবে, তা অনুমান করা কঠিন।
আন্দ্রেই হঠাৎ বললেন, ‘এইমাত্র আমাদের অবস্থানের কাছেই শত্রুদের উপস্থিতি দেখতে পেয়েছেন ড্রোনের পাইলট।’ তারপর সেখান থেকে দ্রুত আমাদের সরে যেতে বলা হলো।
আমাদের বলা হয়েছিল, বাংকারে আমরা বেশিক্ষণ থাকতে পারব না। সেখানে মাটির নিচেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। আমি আন্দ্রির কাছে জানতে চাইলাম, তিনি এবং তাঁর দলের সদস্যরা এখানে আসার ফলে যুদ্ধে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না? জবাবে তিনি বললেন, তুলনামূলক কিছুটা হয়তো এসেছে। তবে নতুন কোনো জায়গায় গিয়ে লড়াইয়ে অংশ নেওয়াটা কঠিন।
আমাদের কথোপকথন চলাকালে বাইরে আঁধার ঘনিয়ে আসছিল। অন্ধকারের মধ্যেও বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে রুশ বাহিনীর গতিবিধি ভিডিও করে পাঠাচ্ছিল ইউক্রেনের ড্রোনগুলো। আন্দ্রেই হঠাৎ বললেন, ‘এইমাত্র আমাদের অবস্থানের কাছেই শত্রুদের উপস্থিতি দেখতে পেয়েছেন ড্রোনের পাইলট।’ তারপর সেখান থেকে দ্রুত আমাদের সরে যেতে বলা হলো।
রাশিয়ার সেনাসংখ্যা অনেক বেশি
এরপর আমরা গেলাম যুদ্ধের সম্মুখসারির বেশ পেছনে একটি অস্থায়ী হাসপাতালে। সেখানে আহত ইউক্রেনীয় সেনাদের চিকিৎসা চলছিল। তাঁদের একজন ভিক্তর। মর্টার বিস্ফোরণে কয়েকটি আঙুল হারিয়েছেন। হাসপাতালের একটি বিছানায় কম্বল গায়ে শুয়ে ছিলেন তিনি।
নিজের চেয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে ফেলে আসা দলের সদস্যদের নিয়ে বেশি বিচলিত হয়ে পড়েছেন ভিক্তর। তিনি বললেন, ‘দলের সদস্যদের ছাড়া আমি থাকতে পারছি না। তাঁরা আমার বন্ধু। আমার দ্বিতীয় পরিবার।’ ভিক্তর জানালেন, যত দ্রুত সম্ভব যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁদের কাছে আবার ফিরে যেতে চান তিনি।
যুদ্ধে রুশ বাহিনীও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ছে। তবে তাদের সেনাসংখ্যা অনেক বেশি। ধারণা করা হচ্ছে, খারকিভ সীমান্তের ওপারে ৩০ হাজারের বেশি রুশ সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। এই অঞ্চলে যুদ্ধের সম্মুখসারিতে রাশিয়ার তুলনায় ইউক্রেনের সেনা কম। অস্ত্রশস্ত্রের দিক দিয়েও পিছিয়ে রয়েছে তারা।
ভিক্তর বললেন, রাশিয়ার বাহিনী একের পর এক হামলা চালিয়ে যাচ্ছিল। তাদের সেনাসংখ্যাও অনেক। যুদ্ধে রুশ সেনারা যা যা চান, তার সবকিছুই তাঁদের দেওয়া হচ্ছে। আর ইউক্রেনের সেনাদের লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য কিছুই নেই। তারপরও তাঁরা যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তায় বিলম্ব যুদ্ধটাকে ইউক্রেনীয় সেনাদের জন্য আরও কঠিন করে তুলেছে। গড় হিসাবে বর্তমানে ইউক্রেনের তুলনায় ১০ গুণ বেশি কামানের গোলা ছোড়ার সক্ষমতা রয়েছে রুশ বাহিনীর। কিয়েভের সামনে এখন একমাত্র আশা—মার্কিন অস্ত্র হাতে পেলে তাদের এই সংকট অনেকটা দূর হবে।
প্রতিরোধের এলাকা বাড়ছে
খারকিভের ভোভচানস্ক শহরে গাছপালার ভেতরে গোপন জায়গায় কামান মোতায়েন করেছে ইউক্রেনীয় বাহিনীর ৫৭তম ব্রিগেড। শহরটি রক্ষায় সেখান থেকে দিনে ৫০ থেকে ১০০টি গোলা ছোড়া হয়। আমরা সেখানে গিয়ে দেখলাম, সেনারা গোলার জন্য অপেক্ষা করছেন। কিছুক্ষণ বাদে ছোট একটি গাড়িতে করে ২০টি গোলা আনা হলো। এ দিয়ে তাঁরা আরও কয়েক ঘণ্টা হামলা চালাতে পারবেন।
৫৭তম ব্রিগেডের এই দলটিকে আগে আরও উত্তরে মোতায়েন করা ছিল। এখন তাদের খারকিভ রক্ষার জন্য আনা হয়েছে। দক্ষিণে রোবোতিন গ্রাম থেকে আনা হয়েছে আরেকটি ব্রিগেডের সেনাদের। ওই গ্রামটির দিকেও অগ্রসর হচ্ছে রুশ বাহিনী। রাশিয়ার হামলার মুখে ইউক্রেন বাহিনীকে এখন আরও বেশি এলাকায় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তায় বিলম্ব যুদ্ধটাকে ইউক্রেনীয় সেনাদের জন্য আরও কঠিন করে তুলেছে। গড় হিসাবে, বর্তমানে ইউক্রেনের তুলনায় ১০ গুণ বেশি কামানের গোলা ছোড়ার সক্ষমতা রয়েছে রুশ বাহিনীর।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে হামলা চালিয়ে বেশ কিছু অঞ্চল দখলে করে নেয় রাশিয়া। এরপর গত বছর পাল্টা হামলার মধ্য দিয়ে সামান্য কিছু অঞ্চল মুক্ত করতে সক্ষম হয় কিয়েভ। এখন সেই অর্জনটাও হারাতে বসেছে তারা। নতুন কোনো অঞ্চল মুক্ত করা নয়, রুশ বাহিনীকে প্রতিরোধ করাই এখন তাদের জন্য দুষ্কর হয়ে পড়েছে।
খারকিভে ইউক্রেনীয় সেনাসংখ্যা বাড়ানোর পর রুশ বাহিনীর অগ্রগতি কিছুটা হলেও ঠেকাতে সক্ষম হচ্ছে কিয়েভ। তবে এখানে একটি প্রশ্ন উঠেছে। তা হলো পুরো ইউক্রেনে যুদ্ধের সম্মুখসারি ১ হাজার ২৮৭ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত। খারকিভে সেনা সরিয়ে আনার ফলে ওই সব অঞ্চলে প্রভাবটা কী হতে পারে?
খারকিভে যেসব এলাকায় রুশ বাহিনী সম্প্রতি অগ্রগতি পেয়েছে, সেখান থেকে তাদের পুরোপুরি পিছু হটানো কঠিন হবে। তবে আগে থেকে প্রস্তুতি নিয়ে রাখলে রাশিয়ার এই অগ্রগতি ঠেকানো যেত বলে মনে করেন ইউক্রেনের আর্টিলারি বাহিনীর কমান্ডার মিখাইলো। তিনি বলছিলেন, ‘আমরা ভোভচানস্ক শহর হারাতে বসেছি। এর আশপাশের গ্রামগুলোও হারানোর পথে। আমরা গাছের গুঁড়ি ও কংক্রিট ব্যবহার করেই (রুশ সেনাদের) প্রতিরোধ করতে পারতাম। এখন আমাদের কামানের গোলা ব্যবহার করতে হচ্ছে এবং অন্যত্র থেকে এখানে সেনাদের সরিয়ে আনতে হচ্ছে।’
ভারতের লোকসভা নির্বাচনের চতুর্থ দফার ভোটগ্রহণ চলছে। সোমবার (১৩ মে) স্থানীয় সময় সকাল ৭টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়। চলবে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত।
এই দফায় দেশটির ১০ রাজ্যের ৯৬টি আসনে ভোটগ্রহণ হচ্ছে। এর মধ্যে অন্ধ্র প্রদেশের ২৫, তেলেঙ্গানার ১৭, উত্তর প্রদেশের ১৩, মহারাষ্ট্রের ১১ এবং মধ্যপ্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের আটটি আসনে ভোট হচ্ছে। এছাড়া বিহারের পাঁচটি, ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ডে চারটি করে এবং জম্মু ও কাশ্মীরের একটি আসনে ভোট হচ্ছে।
৯৬টি আসনে মোট ভোটার ১৭ কোটি ৭০ লাখ। এর মধ্যে পুরুষ ৮ কোটি ৯৭ লাখ আর নারী ৮ কোটি ৭৩ লাখ। ভোটের দায়িত্বে আছেন ১৯ লাখেরও বেশি কর্মী।
এই ধাপে বিরোধীদলীয় নেতা কংগ্রেসের অধীর চৌধুরী, সমাজবাদী পার্টির শীর্ষ নেতা অখিলেশ যাদব, অল ইন্ডিয়া মজলিশ-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন নেতা আসাদউদ্দিন ওয়েইসি-সহ ১ হাজার ৭১৭ প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণ হবে। তারকা প্রার্থীদের মধ্যে আরও রয়েছেন সাবেক ক্রিকেটার ইউসুফ পাঠান, কীর্তি আজাদ, শত্রুঘ্ন সিনহা, মহুয়া মৈত্র, অমৃতা রায়, অভিনেত্রী শতাব্দী রায় ও বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ।
ভারতে মোট সাত দফায় লোকসভা নির্বাচন হবে। ইতোমধ্যে তিন দফার ভোট শেষ হয়েছে। প্রথম তিনটি পর্বে তুলনামূলকভাবে কম ভোটদানের হার, হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের রাজনীতি এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ খবরের শিরোনামজুড়ে থাকলেও চতুর্থ পর্বের শেষে ভারতের নির্বাচনী রাজনীতি কোন দিকে মোড় নেয়, দেশটি এখন সে দিকেই তাকিয়ে। তৃতীয় দফার ভোটগ্রহণের মাধ্যমে ভারতের ৫৪৩টি আসনের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি আসনে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়।
বারজান মাজিদ ওরফে স্করপিয়ন—ইউরোপে মানব পাচারে জড়িত কুখ্যাত এক ব্যক্তি। ২০২২ সালে বেলজিয়ামের আদালতে সাজা হওয়ার পর থেকে লাপাত্তা তিনি। ইরাকের এই নাগরিকের সন্ধানে মাঠে নামেন বিবিসির সাংবাদিক সু মিটসেল। দেশে দেশে ঘুরে বহু চেষ্টা–তদবিরের পর শেষ পর্যন্ত দেখা পান স্করপিয়নের। সুযোগ হয় আলাপের। রোমাঞ্চকর সেসব অভিজ্ঞতাই সবার সামনে তুলে ধরেছেন তিনি।
ইরাকের একটি শপিং মল। মুখোমুখি বসে ছিলাম ইউরোপের সবচেয়ে কুখ্যাত মানব পাচারকারীদের একজনের সঙ্গে। তাঁর নাম বারজান মাজিদ। যুক্তরাজ্যসহ বেশ কয়েকটি দেশের পুলিশের ‘ওয়ান্টেড’ তালিকায় তাঁর নাম রয়েছে।
মাজিদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল দুই দফায়। ইরাকের ওই শপিং মলে, আর পরদিন তাঁর অফিসে। কত অভিবাসীকে তিনি ইংলিশ চ্যানেল পার করিয়েছেন, সে সম্পর্কে ধারণাও নেই তাঁর। মাজিদ বললেন, ‘তা ১ হাজারও হতে পারে, ১০ হাজারও হতে পারে। আমি আসলে সঠিক জানি না। কারণ, সংখ্যাটা গুনে দেখিনি।’
এই মানব পাচারকারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করাটা কয়েক মাস আগেও আমার কাছে একপ্রকার অসম্ভব মনে হতো। তিনি আরেকটা নামেও পরিচিত—‘স্করপিয়ন’ (কাঁকড়াবিছা)। এই নামের মানুষটিকেই প্রথম আমি খুঁজতে বেরিয়েছিলাম। এ কাজে সঙ্গে পেয়েছিলাম রব লরিকে। সাবেক এই সেনাসদস্য এখন অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করছেন।
স্করপিয়ন বা মাজিদ—যে নামেই ডাকা হোক না কেন, বছরের পর বছর ধরে তিনি ও তাঁর দলবল মিলে ইংলিশ চ্যানেল দিয়ে মানব পাচার করে গেছেন। ২০১৮ সাল থেকে গত মাস পর্যন্ত এই চ্যানেল নৌকায় করে পাড়ি দিতে গিয়ে মারা গেছেন ৭০ জনের বেশি। এর মধ্যে ফ্রান্সের উপকূলে সাত বছর বয়সী একটি শিশুসহ মৃত্যু হয়েছে পাঁচজনের।
নৌকায় করে এই যাত্রা বেশ বিপজ্জনক। তবে অর্থ কামানোর জন্য পাচারকারীদের কাছে কাজটি বেশ আকর্ষণীয়। ইংলিশ চ্যানেল পার করাতে জনপ্রতি ছয় হাজার পাউন্ড বা প্রায় ৯ লাখ টাকা নিয়ে থাকেন তাঁরা। ২০২৩ সালে প্রায় ৩০ হাজার অভিবাসী এই চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এ থেকে বোঝাই যায়, পাচারকারীদের লাভের অঙ্কটা কত বড়।
স্করপিয়নের প্রতি আমাদের আগ্রহের শুরু ছোট্ট একটি মেয়েশিশুর সঙ্গে সাক্ষাতের পর। উত্তর ফ্রান্সের একটি অভিবাসী শিবিরে খোঁজ পেয়েছিলাম তার। একটি ডিঙিনৌকায় করে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিতে গিয়ে প্রাণ যেতে বসেছিল ওই শিশুর। নৌকাটি সাগরে চলাচলের জন্য মোটেও উপযুক্ত ছিল না। এমনকি সেটির ১৯ আরোহীর জন্য কোনো লাইফ জ্যাকেটের ব্যবস্থাও ছিল না।
ভূমধ্যসাগরে শরণার্থীবোঝাই একটি নৌকা এভাবেই ডুবে যাচ্ছিলরয়টার্সের ফাইল ছবি
যুক্তরাজ্যের পুলিশ কর্মকর্তারা যখন অবৈধ অভিবাসীদের আটক করেন, তখন তাঁদের মুঠোফোনগুলো যাচাই–বাছাই করে দেখেন। ২০১৬ সালের পর থেকে সন্দেহজনক একটি নম্বরই বারবার সামনে আসছিল। ওই মুঠোফোনগুলোয় নম্বরটি স্করপিয়ন নামে রাখা ছিল। কখনো কখনো একটি কাঁকড়াবিছার ছবি দিয়েও নম্বরটি সেভ করা হয়েছিল।
এই স্করপিয়ন কে, তা আমাদের কাছে খোলাসা করেছিলেন মার্টিন ক্লার্ক নামের যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সির (এনসিএ) একজন জ্যেষ্ঠ তদন্তকারী কর্মকর্তা। তিনি বলেছিলেন, তদন্তের এক পর্যায়ে বোঝা যায়, স্করপিয়ন আসলে বারজান মাজিদ নামের এক কুর্দি ইরাকি।
মাজিদ কিন্তু নিজেই পাচারের শিকার হয়েছিলেন। সে ২০০৬ সালের ঘটনা। তখন তাঁর বয়স ২০ বছর। একটি লরিতে করে তাঁকে যুক্তরাজ্যে পাঠানো হয়েছিল। তবে এক বছর পর তাঁকে দেশটি ছেড়ে যেতে বলা হয়। যদিও আরও কয়েক বছর যুক্তরাজ্যে থেকে গিয়েছিলেন তিনি। এর মধ্যে কিছু সময় নানা অপরাধে কারাগারে থাকতে হয়েছিল তাঁকে।
শেষ পর্যন্ত ২০১৫ সালে মাজিদকে ইরাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এর কিছু সময় পর মানব পাচারের জগতে পা রাখেন তিনি। স্করপিয়ন নামে তাঁর পরিচিত বাড়ে। ধারণা করা হয়, বড় ভাইয়ের হাত ধরেই এ অপরাধে জড়িয়েছিলেন তিনি। তাঁর বড় ভাই তখন বেলজিয়ামের কারাগারে সাজা খাটছিলেন।
আমরা রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপকের কাছে মানব পাচার ব্যবসা সম্পর্কে জানতে চাইলাম। তিনি কাছে থাকা একটি বন্দুক দেখিয়ে বুঝিয়ে দিলেন, আমরা বিপজ্জনক সব মানুষকে নিয়ে কাজ করছি।
২০১৬ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে মানব পাচার–বাণিজ্যের একটি বড় অংশ মাজিদ ও তাঁর দল নিয়ন্ত্রণ করত বলে মনে করা হয়। এরপর দুই বছর ধরে মানব পাচার রোধে অভিযান চালায় আন্তর্জাতিক পুলিশ। অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া মাজিদের দলের ২৬ সদস্যকে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের আদালতে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তবে মাজিদ ছিলেন পলাতক।
মাজিদের অনুপস্থিতিতেই বেলজিয়ামের একটি আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে বিচারকাজ চলে। মানব পাচারের ১২১টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন তিনি। ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে তাঁকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। জরিমানা করা হয় ১২ কোটি টাকার বেশি। এর পর থেকেই মাজিদের আর কোনো খোঁজখবর পাওয়া যায়নি। এই রহস্য ভেদ করতেই নেমেছিলাম আমরা।
স্করপিয়নের খোঁজে তুরস্কে
রব লরির এক সূত্র আমাদের ইরানের এক ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। ওই ইরানি বলেছিলেন, তিনি যখন ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার চেষ্টায় ছিলেন, তখন তাঁর কথা হয়েছিল মাজিদের সঙ্গে। মাজিদ বলেছিলেন, তিনি তুরস্কে থাকেন। সেখান থেকেই মানব পাচার ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন। বেলজিয়ামে মাজিদের বড় ভাইকেও আমরা খুঁজে বের করেছি। তিনি এখন কারাগারের বাইরে। তাঁরও ধারণা, মাজিদ তুরস্কে থাকতে পারেন।
যুক্তরাজ্যে স্থায়ী হতে চাওয়া বেশির ভাগ অভিবাসী আগে তুরস্কে কিছু সময়ের জন্য অবস্থান করেন। কারণ, যুক্তরাজ্যের অভিবাসী আইন অনুযায়ী, আফ্রিকা, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে দেশটিতে প্রবেশের জন্য ভিসা পাওয়া তুলনামূলক সহজ।
একটি সূত্র থেকে আমরা খবর পেয়েছিলাম, মাজিদকে সম্প্রতি তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরের একটি রেস্তোরাঁয় দেখা গিয়েছিল। আমরা সেখানে গেলাম। তবে প্রথম দিকে এই অনুসন্ধান অতটা সহজ ছিল না। আমরা রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপকের কাছে মানব পাচার ব্যবসা সম্পর্কে জানতে চাইলাম। তিনি কাছে থাকা একটি বন্দুক দেখিয়ে বুঝিয়ে দিলেন, আমরা বিপজ্জনক সব মানুষকে নিয়ে কাজ করছি।
তবে খোঁজখবরের পরের ধাপে কিছুটা আশার দেখা পেলাম। খবর পেলাম, কাছের একটি মানি এক্সচেঞ্জে সম্প্রতি প্রায় ২৫ কোটি টাকা জমা দিয়েছেন মাজিদ। ওই মানি এক্সচেঞ্জে আমাদের মুঠোফোন নম্বর রেখে এলাম। সেদিন রাতেই রব লরির ফোন বেজে উঠল। তবে কোন নম্বর থেকে ফোন এসেছে, তা দেখা যাচ্ছিল না। ওপাশ থেকে একজন নিজেকে মাজিদ বলে পরিচয় দিলেন।
আমরা এতটাই হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম ফোনকল রেকর্ড করার সময় পাইনি। রবের যেটুকু মনে আছে, ফোনদাতা বলেছিলেন, ‘আমি শুনলাম, আপনারা আমার খোঁজ করছেন।’ এ সময় রব জানতে চান, ‘আপনি কে? স্করপিয়ন?’ জবাবে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, আপনি কি আমাকে এ নামেই ডাকতে চান? ঠিক আছে ডাকুন।’
ফোনের অপর পাশের ব্যক্তি আসলেই মাজিদ ছিলেন কি না, তা বলা দুষ্কর ছিল। তবে আমরা তাঁর সম্পর্কে যা জানতাম, তার সঙ্গে ওই ব্যক্তির কথাবার্তার মিল পেয়েছি। যেমন তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাজ্য থেকে ইরাকে পাঠিয়ে দেওয়ার আগে তিনি নটিংহামে ছিলেন। তবে বর্তমানে মানব পাচারে জড়িত থাকার বিষয়টি উড়িয়ে দিয়ে বলেন, ‘এটা সত্যি নয়। গণমাধ্যমের সৃষ্টি।’
পরে ফোনকলটি কেটে গিয়েছিল। ওই ব্যক্তি কোথা থেকে ফোন করেছিলেন, তা–ও জানতে পারলাম না। তিনি আবার কখন ফোন করতে পারেন, সে সম্পর্কেও কোনো ধারণা ছিল না। এরই মধ্যে স্থানীয় এক সূত্রের কাছ থেকে খবর পেলাম, মাজিদ এখন তুরস্ক থেকে গ্রিস ও ইতালিতে মানব পাচার করছেন।
এরপর আমাদের কাছে যে তথ্য এল, তা ছিল ভয় ধরানো। নারী, শিশুসহ প্রায় ১০০ জনকে নাকি নৌকায় করে পাচার করা হচ্ছে। তবে ওই নৌকায় মাত্র ১২ জনকে বহনের লাইসেন্স রয়েছে। আর সেগুলো চালায় অনভিজ্ঞ পাচারকারীরাই। কোস্টগার্ডকে এড়াতে নৌকাগুলো যে পথ ধরে যায়, সেটিও বিপজ্জনক।
পরেরবার যখন মাজিদের ফোন এসেছিল, তখন বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করলাম। এবারও তিনি পাচারে জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করলেন। তাঁর কথায় এটাই বোঝা গেল, যাঁরা মানব পাচারের সঙ্গে সশরীর যুক্ত থাকেন, তাঁদেরই পাচারকারী বলে মনে করেন তিনি; যাঁরা নিয়ন্ত্রণ করেন, তাঁরা নন।
অবশেষে সাক্ষাৎ
এরই মধ্যে আমাদের এক সূত্র জানালেন, তিনি ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে সুলাইমানিয়া শহরের একটি মানি এক্সচেঞ্জে মাজিদকে দেখেছেন। আমরা সেখানে গেলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম, যদি ইরাকে মাজিদের খোঁজ না পাই, তাহলে এ নিয়ে আর এগোব না।
এর এক পর্যায়ে ইরাকে মাজিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল রবের ওই সূত্রের। মাজিদ আমাদের নিয়ে খুবই সন্দেহের মধ্যে ছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, আমরা অর্থ দাবি করব বা তাঁকে ইউরোপে ফিরিয়ে নিয়ে যাব। এরপর আমাদের সঙ্গে মাজিদের বেশ কয়েকবার বার্তা আদান–প্রদান হয়। তিনি বলেন, আমাদের সঙ্গে দেখা করতে রাজি আছেন। তবে সাক্ষাতের স্থান ঠিক করবেন তিনি নিজে। আমরা তা মেনে নিইনি। কারণ, ভয় ছিল, মাজিদ ফাঁদ পাততে পারেন।
তারপরই আমাদের মুঠোফোনে একটি বার্তা এল। লেখা, ‘আপনারা কোথায়?’ আমরা বললাম, কাছের একটি শপিং মলের দিকে যাচ্ছি। মাজিদ আমাদের ওই মলের নিচতলায় একটি রেস্তোরাঁয় দেখা করার জন্য বললেন। ঠিক সেখানেই আমরা তাঁর প্রথম দেখা পেলাম। মাজিদ বেশ দৃষ্টিনন্দন পোশাক পরে ছিলেন। পরনে ছিল নতুন জিনসের প্যান্ট ও হালকা নীল রঙের শার্ট। এরই মধ্যে কাছের একটি টেবিলে গিয়ে বসলেন তিনজন। বোঝাই যাচ্ছিল, তাঁরা মাজিদের নিরাপত্তারক্ষী।
এবারও মাজিদ এখন মানব পাচারে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করলেন। অন্যান্য অপরাধী চক্রের সদস্যরা নাকি নিজেদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাঁকে জড়াচ্ছেন। তিনি বললেন, ‘তারা যখন গ্রেপ্তার হয়, তখন বলে, আমরা তার (মাজিদ) হয়ে কাজ করি। আসলে তারা কম সাজা পেতেই এটা করে।’
আমরা যখন অভিবাসীদের মৃত্যুর জন্য মাজিদকে দোষারোপ করলাম, তিনি সেই আগের কথাই বললেন, যাঁরা অভিবাসীদের নৌকায় বা লরিতে তুলে দেন, তাঁরাই পাচারকারী। তিনি নিজে কখনো কাউকে নৌকায় তুলে দেননি। তাই নৌকাডুবিতে কারও মৃত্যুর জন্যও তিনি দায়ী নন। তিনি শুধু অর্থ নিয়েছেন আর অভিবাসীদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে, তা ঠিক করে দিয়েছেন।
মাজিদের পেছনে থাকা কাচে তাঁর হাতে থাকা মুঠোফোনের স্ক্রিনের সবকিছু ভেসে উঠছিল। মাজিদ টের না পেলেও রব তা দেখতে পেয়েছিলেন।
সেদিন আমাদের কথোপকথন সেখানেই শেষ হলো। এর পরদিন সুলাইমানিয়ার সেই মানি এক্সচেঞ্জে রবকে আমন্ত্রণ জানালেন মাজিদ। ইউরোপে যাওয়ার জন্য সেখানে গিয়ে অর্থ পরিশোধ করেন অভিবাসীরা। রব আমাকে বলেছিলেন, সেখানে নাকি তিনি এক ব্যক্তিকে এক বাক্স অর্থ নিয়ে আসতে দেখেছিলেন।
মাজিদ সেদিন রবকে বলেছিলেন ২০১৬ সালে তিনি কীভাবে এই ব্যবসায় জড়িয়েছিলেন। তখন হাজার হাজার মানুষ অভিবাসী হয়ে ইউরোপে যাচ্ছিল। মাজিদ বলেন, ‘কেউ তাদের ইউরোপে যাওয়ার জন্য জোরাজুরি করেনি। তারা নিজেরাই যেতে চায়। পাচারকারীদের কাছে তারা বলে, দয়া করে আমাদের জন্য এটা করে দিন। কখনো কখনো পাচারকারীদের এটাও বলতে শুনেছি, শুধু সৃষ্টিকর্তার জন্য আমি তাদের সাহায্য করব। এরপর তারা (অভিবাসী) নানা অভিযোগ করে। আসলে এগুলো সত্যি নয়।’
মাজিদ বললেন, ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি বেলজিয়াম ও ফ্রান্সে মানব পাচার কর্মকাণ্ডে শীর্ষ দুই ব্যক্তির একজন ছিলেন। সে সময় লাখ লাখ ডলার লেনদেন করেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘আমি তাদের জন্য বহু কিছু করেছি।’
মাজিদ যদিও দাবি করেন, তিনি এখন আর মানব পাচারে জড়িত নন, তবে তাঁর কাজকর্মে উল্টোটাই মনে হয়েছে। যেমন রবের সঙ্গে কথা বলার সময় হাতে থাকা মুঠোফোনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন তিনি। মাজিদের পেছনে থাকা কাচে ওই মুঠোফোনের স্ক্রিনের সবকিছু দেখা যাচ্ছিল। মাজিদ টের না পেলেও রব তা দেখতে পেয়েছিলেন।
মাজিদের মুঠোফোনের স্ক্রিনে রব দেখেছিলেন সারি সারি পাসপোর্ট নম্বর। পরে আমরা জানতে পারি, ওই নম্বরগুলো ইরাকের সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে পাঠায় পাচারকারীরা। ওই কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়ে ভুয়া ভিসা নেওয়া হয়। তারপর ওই ভিসা দেখিয়ে তুরস্কে যান অভিবাসীরা।
সেটিই ছিল মাজিদ ওরফে স্করপিয়নের সঙ্গে আমাদের শেষ দেখা। এরপর তাঁর সঙ্গে এই সাক্ষাতের বিষয়ে আমাদের কথা হয়েছিল বেলজিয়ামের সরকারি কৌঁসুলি অ্যান লুকোউইয়াকের সঙ্গে। মাজিদকে দোষী সাব্যস্ত করার কাজে সংশ্লিষ্ট ছিলেন তিনি। অ্যান বলেন, ‘একদিন না একদিন আমরা তাঁকে পাকড়াও করবই।’ সূত্র: বিবিসি
ডুমুরিয়া উপজেলা নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়নের উদ্যোগে মহান মে দিবস পালিত হয়েছে। বুধবার সকালে দিবসটি পালন উপলক্ষে শ্রমিক ইউনিয়নের উদ্যোগে র্যালী ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
ডুমুরিয়া ছোট বাজারস্থ নিজস্ব কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় সভাপতিত্বে করেন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মোঃ নজরুল ইসলাম গাজী।সভায় অতিথি হিসেবে উপস্হিত ছিলেন ইউপি চেয়ারম্যান গাজী হুমায়ুন কবির বুলু, শ্রমিক ইউনিয়নের উপদেষ্টা মুফতি আবদুল কাইয়ুম জমাদ্দার, বক্তব্য দেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী শাহজাহান জমাদ্দার,মাহাবুর রহমান মল্লিক,বি,এম নাজিম উদ্দীন,সাবেক সভাপতি শেখ রফিকুল ইসলাম,বাবর আলী শেখ,আলমগীর মোড়ল,ইউনুছ আলী বিশ্বাস ও আ: মান্নান সরদার, সহসভাপতি আবদুর রহিম,সাধারণ সম্পাদক আ: খালেক গাজী,মুন্তাজ গাজী,ফারুক মল্লিক,রবিউল মোল্যা,ফয়সাল হোসেন,সালাউদ্দীন সানা,বিল্লাল হোসেন গাজী,ওবাইদুল্লাহ সানা,সাইফুল ইসলাম গাজী,মফিজুল ইসলাম,মোমিন খান প্রমূখ।
আলোচনা সভার পূর্বে একটি বর্ণাঢ্য র্যালী বাজারের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিন করে।
যাদের যুক্তি পছন্দ তাদের পক্ষে জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টকে উপেক্ষা করা অসম্ভব৷ সোমবার তার ৩০০তম জন্মবার্ষিকী ছিল৷ ‘চিরস্থায়ী শান্তি’র এই লেখকের দর্শন আজও প্রাসঙ্গিক৷
১৭২৪ সালের ২২ এপ্রিল পূর্ব প্রুশিয়ার ক্যোনিগসব্যার্গে (বর্তমান রাশিয়ার কালিনিনগ্রাদ) জন্মেছিলেন কান্ট৷
দুনিয়াকে বুঝতে হলে যে আপনাকে পৃথিবী ভ্রমণে বের হতে হবে, তা নয়৷ কান্ট কখনও তার শহর ক্যোনিগসব্যার্গ ছেড়ে যাননি৷ কিন্তু তারপরও তিনি দুনিয়া নিয়ে যে দর্শন দিয়েছেন তাতে সমৃদ্ধ হয়েছে দর্শনশাস্ত্র৷
শুধু তাই নয়, ১৭ শতকে তার হাত ধরেই ইউরোপে এনলাইটেনমেন্ট বা আলোকায়ন যুগ শুরু হয়েছিল৷ এনলাইটেনমেন্ট ছিল একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন, যার উদ্দেশ্য ছিল বিজ্ঞান ও সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে প্রথাগত বিশ্বাস ও কুসংস্কারের শাসন থেকে মানুষকে মুক্ত করে সমাজকে মানবিকতার পথে পরিচালিত করা৷
কান্টকে সর্বকালের সেরা চিন্তাবিদদের একজন ধরা হয়৷ তার অনেক দর্শন আজও প্রাসঙ্গিক৷ ১৭৯৫ সালে লেখা ‘অন পার্পেচুয়াল পিস’ প্রবন্ধে তিনি বিশ্বের সব প্রজাতন্ত্রের সমন্বয়ে ‘লিগ অফ নেশনস’ নামের একটি কেন্দ্রীয় সংগঠন তৈরি পরামর্শ দিয়েছিলেন৷ সেই পরামর্শ অনুসারেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ‘লিগ অফ নেশনস’ তৈরি হয়েছিল, যেটি আজকের জাতিসংঘ৷
কান্ট মনে করতেন, প্রতিটি মানুষের বিশ্বের যে কোনো দেশে যাওয়ার অধিকার রয়েছে৷ তবে সেই দেশে তাকে সাদরে গ্রহণ করা হবে, বিষয়টা তেমন নাও হতে পারে৷
মানুষের মর্যাদা ও মানবাধিকারকে ধর্ম দিয়ে নয়, দার্শনিকভাবে যুক্তি দিয়ে বিচারের কথা বলতেন কান্ট৷
মানুষের উপর তার অগাধ বিশ্বাস ছিল৷ তিনি মনে করতেন, নিজের ও বিশ্বের সবার দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষমতা মানুষের আছে৷ তাই তিনি মানুষকে এমনভাবে কাজ করতে বলতেন যেনস সেটা পরবর্তীতে সযে-কোনো সময় পৃথিবীর সবার জন্য আইন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে৷ আজকের বিচারে তার এই কথাটা এভাবে বলা যেতে পারে: আপনার শুধু তা-ই করা উচিত যেটা সবার জন্য ভালো হবে৷
১৭৮১ সালে প্রকাশিত কান্টের ‘ক্রিটিক অফ পিউর রিজন’ বইটি বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের সন্ধিক্ষণ হিসাবে বিবেচিত হয়৷ এই বইয়ে তিনি দর্শনের চারটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরেছেন: আমি কী জানতে পারি? আমার কী করা উচিত? আমি কী আশা করতে পারি? আর মানুষ কী?
তার আগে পৃথিবীতে আসা অনেক দার্শনিকের বিপরীত চিন্তা করতেন কান্ট৷ তিনি বলেছেন, মানুষের মন ঈশ্বরের অস্তিত্ব, আত্মা বা পৃথিবীর শুরুর মতো প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পারে না৷
কান্টের সমসাময়িক জার্মান রোমান্টিক লেখক জ্যঁ পাউল (১৭৬৩-১৮২৫) বলেছিলেন, ‘‘কান্ট পৃথিবীর আলো নয়, তিনি একটি দীপ্তিমান সৌরজগত৷”
উপনিবেশবাদ ও দাসত্বের বিরোধী ছিলেন কান্ট৷
দৈনন্দিন জীবনে কঠোর নিয়মনীতি মনে চলতেন কান্ট৷ পরিবার ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে অনেক সময় নিয়ে দুপুরের খাবার খেতেন, বিলিয়ার্ড খেলতে পছন্দ করতেন, আর খেলতেন কার্ড গেমস৷ থিয়েটারে যেতেও পছন্দ করতেন তিনি৷ আর চুল কাটার দোকানে কান্ট গল্প বলে সবাইকে আনন্দ দিতে পারতেন বলে জানা যায়৷
কান্টের ৩০০তম জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে জার্মানিতে অনেক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে৷ যেমন বন শহরে ‘আনরিজলভড ইস্যুস’ শীর্ষক একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে৷ এছাড়া জুন মাসে বার্লিনে একটি অ্যাকাডেমিক কনফারেন্স ও বছরের শেষ দিকে বন শহরে আন্তর্জাতিক কান্ট কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে৷ এই সম্মেলনটি কান্টের জন্মভূমি কালিনিনগ্রাদে করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে স্থান পরিবর্তন করা হয়েছে৷ Source DW
ফুংসুক ওয়াংচুক বললে এখনো অনেকের চোখে ভেসে ওঠে বলিউডের সিনেমা ‘থ্রি ইডিয়টস’-এর আমির খানের মুখ। ফুংসুক ওয়াংচুক ছিলেন ওই সিনেমার সেই নায়ক, যার ডাক নাম ছিল ‘র্যাঞ্চো’। তাঁর খোঁজে তিন বন্ধু পাড়ি দিয়েছিলেন লাদাখের রাজধানী লেহ।
সিনেমার সেই ‘র্যাঞ্চো’ বাস্তবে লাদাখের অতিপরিচিত পরিবেশবিদ সোনম ওয়াংচুক। লাদাখকে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা, পরিবেশ রক্ষাসহ কয়েকটি দাবিতে তিনি ‘আমরণ অনশন’ কর্মসূচি শুরু করেছেন। আজ বুধবার ১৫ দিনে পড়ল তাঁর অনশন। খোলা আকাশের নিচে মাইনাস ১৫ ডিগ্রিতে তাঁর সঙ্গে দিনরাত অতিবাহিত করছেন আরও অন্তত ২৫০ থেকে ৩০০ জন লাদাখবাসী। অথচ কেন্দ্রীয় সরকার এখনো হেলদোলহীন।
ম্যাগসাইসাইজয়ী সোনম ওয়াংচুক আজ বুধবার সরাসরি জানতে চাইছেন, লাদাখের পর্বতরাজি বিভিন্ন শিল্প সংস্থা ও খনির কারবারিদের কাছে বেচে দিতে কেন্দ্রীয় সরকার এই বিস্তীর্ণ এলাকাকে কাশ্মীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করেছে কি না।
সোনম ওয়াংচুক ও তাঁর সঙ্গীরা আমরণ অনশনের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন ৪ মার্চ। সেই দিন কেন্দ্রীয় সরকার লাদাখবাসীদের জানিয়ে দিয়েছিল, তাদের সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব নয়। প্রতিবাদে ৬ মার্চ থেকে সোনম ও তাঁর অনুগামী সমর্থকেরা আমরণ অনশনের সিদ্ধান্ত নেন।
ওই দিন থেকে খোলা আকাশের নিচে রচিত হচ্ছে ওয়াংচুক ও তাঁর সহযোগীদের দিবারাত্রির কাব্য। তাঁদের আন্দোলনে প্রতিদিন যোগ দিতে হাজির হচ্ছেন লাদাখের হাজার হাজার মানুষ। রুখু লাদাখের পাহাড় ও নদী পেরিয়ে সেই আন্দোলনের ঢেউ ভারতের মূল ভূখণ্ডের প্রথম সারির গণমাধ্যমে প্রতিফলিত হচ্ছে যৎসামান্যই। তাতে বাস্তবের ‘র্যাঞ্চো’ যদিও ভ্রুক্ষেপহীন। তাঁর কথায়, সত্যের পথে থাকলে জয় অবধারিত।
২০১৯ সালের ৫ আগস্ট জম্মু-কাশ্মীর থেকে লাদাখকে বিচ্ছিন্ন করে গড়ে তোলা হয়েছিল দুই পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ। অবিভক্ত ওই রাজ্যে বিধানসভা ছিল। কেন্দ্রশাসিত জম্মু-কাশ্মীরকে বিধানসভা দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার।
সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের পর সাড়ে চার বছর পার হয়ে গেছে। রাজ্যের মর্যাদা জম্মু-কাশ্মীর এখনো পায়নি। হয়নি বিধানসভার নির্বাচনও। লাদাখবাসীও পায়নি তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো।
অনশনরত সোনম ওয়াংচুক সেই কথা সবাইকে মনে করিয়ে দিয়ে এক বার্তায় বলেছেন, ২০১৯ সালের লোকসভা ভোট ও ২০২০ সালের পার্বত্য পরিষদের নির্বাচনের সময় বিজেপির সরকার বলেছিল, লাদাখকে সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের রক্ষাকবচ দেওয়া হবে। সেই প্রতিশ্রুতি তাদের বিপুল ভোটে জয়ী করেছিল।
তার পর থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি রক্ষার ধারকাছে দিয়ে সরকার হাঁটেনি। বরং ৪ মার্চের বৈঠকে জানিয়ে দেওয়া হয় ষষ্ঠ তফসিল দেওয়া যাবে না। পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা বা বিধানসভাও নয়।
কারগিল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (কেডিএ) ও লেহ অ্যাপেক্স কাউন্সিলের ৬ সদস্যের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ওই বৈঠক করেছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। অথচ আগে তিনি বারবার বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী জমি, চাকরি ও সংস্কৃতি রক্ষায় লাদাখের রক্ষাকবচের ব্যবস্থা সরকার করবে।
সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে কেডিএ ও লেহ অ্যাপেক্স কাউন্সিলও সহমত, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হওয়ার কারণে লাদাখের জমি ও খনিজ পদার্থের ভার ধীরে ধীরে শিল্পপতিদের হাতে চলে যাবে, যার ফলে ভঙ্গুর লাদাখের পরিবেশ বিপন্ন হবে। সোনমের আন্দোলন তাই দ্বিমুখী। রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষা।
সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিল অনুযায়ী আসাম, মেঘালয়, মিজোরাম ও ত্রিপুরায় তফসিল উপজাতি অধ্যুষিত মোট ১০টি জেলা রয়েছে, যেখানে তাদের স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা জারি রয়েছে।
জম্মু-কাশ্মীর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর লাদাখে স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য সংরক্ষণব্যবস্থা চালু হয়নি। বিধানসভার মতো গণতান্ত্রিক কাঠামোও দেওয়া হয়নি। ফলে মানুষের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো গণতান্ত্রিক রীতিও নেই। কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলটি চালিত হচ্ছে দিল্লির মর্জিমাফিক। তাদের নিযুক্ত আমলাদের দিয়ে।
সোনম ওয়াংচুকের অভিযোগ, মানুষের মোহভঙ্গ ঘটেছে। প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করায় লাদাখে সেনাদের মনোবলও ভেঙে পড়ছে। এই বৈচিত্র্যপূর্ণ লাদাখের পরিবেশ রক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করানোর পাশাপাশি সোনম ওয়াংচুক চান লাদাখের জন্য পূর্ণ রাজ্য ও ষষ্ঠ তফসিলের মর্যাদা।
সোনম ওয়াংচুকের আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছে কারগিল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (কেডিএ)। আজ তারা গোটা লাদাখে অর্ধদিবস ধর্মঘট পালন করে। ২৪ মার্চ, অনশন আন্দোলনের ২১তম দিনে লাদাখের পরিবেশ রক্ষায় বিশ্বব্যাপী সহমর্মিতা জানানোর আবেদন জানিয়েছেন সোনম ওয়াংচুক।