//আন্তর্জাতিক ডেস্ক//
ইউক্রেনে ব্যাপকভাবে আঘাত হানবে রাশিয়া। নিজেদের শক্তিশালী বিমানবাহিনীকে দ্রুত মাঠে নামিয়ে ইউক্রেনের আকাশে নিজ যুদ্ধবিমানের আধিপত্য প্রদর্শন করবে মস্কো। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি দেশটিতে আকস্মিক রুশ অভিযান শুরুর আগে এমনটাই আভাস দিয়েছিলেন মার্কিন গোয়েন্দারা।
হামলা শুরুর পর আট দিন পেরিয়ে গেছে। এই সময়ে ইউক্রেনে রুশ বিমানবাহিনীর তত্পরতা নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দাদের আভাসের বিপরীত চিত্রই যেন দেখা গেছে। যুদ্ধে নিজের বিমানশক্তিকে এখন পর্যন্ত জোরালোভাবে খাটায়নি দেশটি। কিন্তু কেন? সেই প্রশ্নের জবাব খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে আল–জাজিরা ও দ্য মস্কো টাইমসের প্রতিবেদনে।
যুক্তরাজ্যের গবেষণা প্রতিষ্ঠান জেনসের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া ও ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর শক্তির ফারাক বেশ বড়। রাশিয়ার হাতে ১৩২টি বোমারু বিমান রয়েছে, যেখানে ইউক্রেনের কোনো বোমারু বিমান নেই। রাশিয়ার ৮৩২টি যুদ্ধবিমানের বিপরীতে ইউক্রেনের রয়েছে ৮৬টি। রাশিয়া ও ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর পরিবহন উড়োজাহাজের সংখ্যাও যথাক্রমে ৩৫৮ ও ৬৩।
রাশিয়া–ইউক্রেন দুই দেশের বিমানবাহিনীর অন্যান্য অস্ত্রের তুলনামূলক চিত্রটাও অনেকটা একই। তবে ড্রোনের সংখ্যার দিক দিয়ে এগিয়ে রয়েছে ইউক্রেন। দেশটির ৬৬টি ড্রোনের বিপরীতে রাশিয়ার রয়েছে মাত্র ২৫টি।
হামলা শুরুর পর মার্কিন গোয়েন্দাদের মতো আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সমর বিশেষজ্ঞদের ধারণা ছিল, শুরুতেই ইউক্রেনের বিমানবাহিনী ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের চেষ্টা করবে রুশ যুদ্ধবিমানগুলো। ‘দ্য মিস্ট্রিয়াস কেস অব দ্য মিসিং রাশিয়ান এয়ার ফোর্স’ শিরোনামে যুক্তরাজ্যের গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (আরইউএসআই) প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমেই প্রতিপক্ষের বিমানবাহিনী ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করা ‘প্রত্যাশিত একটি পদক্ষেপ’। ১৯৩৮ সাল থেকে প্রায় সব যুদ্ধে এমনটিই দেখা গেছে। তবে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে ইউক্রেনে।
রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক শক্তিতে ব্যাপক ফারাক থাকা সত্ত্বেও ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর বেশ তত্পরতা দেখা যাচ্ছে। তারা আকাশ ও স্থলপথে রুশ বাহিনীকে লক্ষ্য করে স্বল্প পরিসরে পাল্টা প্রতিরক্ষামূলক হামলা পরিচালনা করছে। যুদ্ধের ময়দানে ইউক্রেনীয় আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও এখন পর্যন্ত সফল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। দেশটির ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষিপ্ত রকেট যেমন রুশ যুদ্ধবিমানের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তেমনি রুশ পাইলটদের জীবনের ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে।
জেনসের কর্মকর্তা গ্যারেথ জেনিংস বলেন, বিশাল সংখ্যার কারণে রাশিয়ার বিমানবাহিনী শক্তি–সামর্থ্যের দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে। তারপরও ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর তত্পরতা রুখতে ও রুশ বাহিনীকে ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষায় আকাশে যে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা দরকার, সেটি রাশিয়া অর্জন করতে পারেনি।
বর্তমানে রুশ বিমানবাহিনীর সীমিত তৎপরতার কারণ কী, তার পরিষ্কার ব্যাখ্যা নেই মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষাবিষয়ক একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, নিজেদের যুদ্ধবিমান ও পাইলটদের বড় ঝুঁকির মুখে ফেলার ইচ্ছা নেই রাশিয়ার।
অপর দিকে রাশিয়ার ভাবগতিকে বিভ্রান্তিকর বলে আখ্যায়িত করেছেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফরেন পলিসির রুশ সেনাবাহিনীবিষয়ক বিশেষজ্ঞ রব লি। তাঁর মতোই অনেকটা মত সাবেক ফরাসি সেনা কর্মকর্তা মিশেল গোয়ার। তাঁর কথায়, ‘রাশিয়ার বিমানবাহিনীর দক্ষতার ঘাটতি এই সংঘাতে বিস্ময় জাগানো কারণসমূহের একটি।’
ইউক্রেনে হামলা শুরুর পর রাশিয়ার স্থলবাহিনীর সঙ্গে বিমানবাহিনীর সমন্বয়ে ঘাটতি দেখছেন কোনো কোনো সামরিক বিশ্লেষক। তাঁরা বলছেন, ইউক্রেনে রুশ স্থলবাহিনীকে কয়েকটি বড় দলে পাঠানো হয়েছে। দলগুলোর কয়েকটিকে শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষায় রাশিয়ার বিমানবাহিনীর নজরদারি দেখা যায়নি। এর মধ্যে আবার তুরস্কের ড্রোন এবং যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের ট্যাংকবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র হাতে পাওয়ায় শক্তি বেড়েছে ইউক্রেনের। ফলে অরক্ষিত রুশ সেনারা আক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ছেন।
ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে মস্কোসমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে গত আট বছরের লড়াই থেকে অভিজ্ঞতা নিয়েছে দেশটির সেনাবাহিনী। যদিও লড়াই চলছে মূলত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো পুরোনো ধাঁচে। অপর দিকে সিরিয়ার যুদ্ধ থেকে অভিজ্ঞতা নিয়েছে রাশিয়া। সিরিয়ায় স্থলযুদ্ধ কৌশলের সঙ্গে বিমান ও ড্রোন হামলার সমন্বয়ের ক্ষেত্রে কিছুটা সক্ষমতার জানান দিয়েছে তারা। সিরিয়ার অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও ‘নির্ভুলতা, নমনীয়তা ও আন্তঃকার্যক্ষমতার’ দিক দিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর বিমানবাহিনীর চেয়ে রুশ বিমানবাহিনী অনেক পিছিয়ে রয়েছে বলে মত দিয়েছেন ফরাসি সেনা কর্মকর্তা মিশেল গোয়া।
যুদ্ধের শুরু থেকেই রাশিয়ার বিমানশক্তি ব্যবহারে অনাগ্রহ অবাক করেছে অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা ডেভিড ডেপতুলাকে। তিনি বলেন, কোনো যুদ্ধে একাধিক বাহিনীর সমন্বয় করা যে অতটা সহজ না, তা রাশিয়া বুঝতে পেরেছে। এ বিষয়ে তাদের যতটা দক্ষ মনে করা হচ্ছিল, আদতে তেমনটা তারা নয়।
রাজধানী কিয়েভ ও অন্য শহরগুলোতে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও বেশ শক্ত অবস্থানে রয়েছে। এসব স্থানে বিমান হামলা চালাতে রাশিয়াকে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়তে হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। কারণ, বেশি নিচু থেকে হামলা চালালে যুদ্ধবিমানগুলো আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার আওতায় এসে ধ্বংস হতে পারে। অপর দিকে অনেক উঁচু থেকে হামলা হলে বেসামরিক লোকজনের ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি থাকছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান এফএমইএসের গবেষণা প্রধান পিয়েরে রাজউক্স বলেন, ‘আপনারা বুঝতে পারছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন পরস্পরবিরোধী উদ্দেশ্যের পেছনে ছুটছেন। একদিকে নিজের ক্ষমতা জাহির করছেন। অপর দিকে যেকোনো মূল্যে (যত ক্ষয়ক্ষতিই হোক) একটি শহর দখলের মতো সীমাকেও অতিক্রম করছেন না।’
রুশ যুদ্ধবিমানের পাইলটদের মধ্যে সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানার সক্ষমতার অভাব থাকতে পারে বলে মনে করেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান আরইউএসইর উড়োজাহাজ বিশেষজ্ঞ জাস্টিন ব্রঙ্ক। রুশ বিমান হামলা দেরিতে শুরুর এটিও একটি কারণ হতে পারে বলে ধারণা তাঁর।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, সিরিয়ায় রুশযুদ্ধবিমানগুলো হামলা চালাতে প্রায়ই আনগাইডেড মিসাইলের ওপর নির্ভর করত। এ থেকে এই ইঙ্গিত মিলছে, রাশিয়ার পাইলটরা শুধু লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানার সঙ্গে কম পরিচিতই নন, দেশটির বিমানবাহিনীতে এমন প্রযুক্তির অভাবও রয়েছে। আবার ভুলবশত নিজেদের সেনাদের ওপরই হামলার শঙ্কা জোর বিমান হামলার ব্যাপারে দেশটির বিমানবাহিনীর অনাগ্রহের আরেক কারণ বলে মনে করেন জাস্টিন ব্রঙ্ক।
এদিকে আপাতত ইউক্রেনে রুশ বিমানবাহিনী ততটা তত্পর না হলেও, শিগগিরই এমন পরিস্থিতি না–ও থাকতে পারে বলে মনে করছেন ব্রঙ্ক।
তথ্যসূত্র: আল–জাজিরা, মস্কো টাইমস, রয়টার্স ও এএফপি
সরকার সাম্প্রদায়িক অপশক্তি বিনাশে বদ্ধপরিকর : ড. হাছান মাহমুদ

