//আবুল হাসেম, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি//
চট্টগ্রামে মৌসুমী ফলের বাজার ঘুরলে মনে হবে আগুন লেগেছে। যার কারনে সব কিছুর দাম হাতের নাগালের বাইরে। নিম্ন আয়ের মানুষের ঘরে মৌসুমী ফল এখন অনেকটা বিলাসীতাতে পরিনত হয়েছে। কলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন মৌসুমের তরমুজ, পেঁপে, আনারস, আনার ও আংগুরসহ সব ধরনের ফলের দাম এখন আকাশচুম্বী। কয়েকদিন আগেও এক হালি কলা বিক্রি হয়েছে ২০ থেকে ২৫ টাকায়। যা বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০-৭০ টাকায়। ৩ থেকে ৪ কেজি ওজনের তরমুজ বাজারে বিক্রি হয়েছে ১৮০ থেকে ২২০ টাকায়। যা বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকায়। অতিরিক্ত দামের কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ এসব ফল কিনতে পারছে না।
পুষ্টিবিদরা বলছেন, সুস্থ থাকতে হলে নিয়মিত ফল খেতে হবে। কিন্তু নিম্ন আয়ের মানুষেরা সুস্থ থাকবে কিভাবে? ‘খাদ্য’ মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার। নিম্ন আয়ের মানুষের সে অধিকার রক্ষা করবে কে? পুষ্টি চাহিদা পূরণ না হলে মানুষের শরীওে বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি হয়। এমনকি ওসব রোগের কারণে মানুষ অকালে মারা যাচ্ছে। তবে কি তারা এভাবেই মরবে? এসব প্রশ্ন সচেতন মহলের। শুধু নিম্ন আয়ের মানুষ নয়, নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরাও মৌসুমী খেতে পারছে না।
কুড়িগ্রামের আলী আকবর রিকশা চালান চট্টগ্রামে। যা আয় হয় তাতে পাঁচ সদস্যের সাংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। রমজানে তার সন্তানের তরমুজ খাওয়ার বায়না ধরেছে। আলী আকবর নগরীর আন্দরকিল্লা এসেছেন তরমুজ কিনতে। বিধিবাম তরমুজের দাম শুনে আলী আকবর থমকে যায়। পরিবারের নিয়মিত খরচ মেটাতেই পারেন না আলী আকবর। এতো দামে তরমুজ কেনার সামর্থ্য তার নেই। আলী আকবরের অভিযোগ, অতিরিক্ত দামের কারণে ফল কিনতে পারেন না তিনি। শুধু আলী আকবর নয়, এমন হাজার/লক্ষ আলী আকবর আছে যারা দামের কারণে মৌসুমী ফল কিনতে পারছেন না।
নগরীর চকবাজার ও বহদ্দারহাটসহ বিভিন্ন এলাকার ভাসমান ফল বিক্রেতা ও স্থায়ী ফলের দোকান সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, অনেকেই বিভিন্ন ফলের দাম জিজ্ঞেস করে, দরাদরি করে। দাম কমে না। পরে ফ্যাকাসে মুখে ফল না কিনে চলে যাচ্ছে। এর উল্টো চিত্রও দেখা যাচ্ছে। অনেকে বিভিন্ন ফলের নাম ও পরিমাণ বলে দিচ্ছে দোকানিকে। পরে হিসাব করে টাকা দিয়ে ফল কিনে নিয়ে যাচ্ছে তারা। একই দোকানে দুই চিত্র। তবে ফল কিনতে না পেরে ফ্যাকাশে মুখের সংখ্যা অনেক বেশি।
নগরীর চকবাজারে আকারভেদে কেজিতে আংগুর বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায়। আনার বিক্রি হচ্ছে ২৪০ টাকা থেকে ২৬০ টাকা দরে। ছোট আকারের একজোড়া আনারস ১০০ টাকা, এক কেজি পেঁপে ৯০ থেকে ১০০ টাকা, আকারভেদে বেলের জোড়া ১০০ থেকে ১৫০ টাকা, ড্রাগন ফল ৪৪০ থেকে ৪৬০ টাকা, মানভেদে আপেল ১৭০ থেকে ২০০ টাকা, কমলা ১৮০ থেকে ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এসব ফল নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে।
আগে পেয়ারা বিক্রি হতো ডজন হিসাবে। এখন সেটি মেশিনে উটে কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। দামও আগের তুলনায় বেশি। বড় সাইজের ৩ থেকে ৪টি পেয়ারার ওজন হচ্ছে ১ কেজি। দাম ৮০ থেকে ১০০ টাকা। কালাম নামের এক ক্রেতা বলেন, ‘আগে পেয়ারার ডজন কিনতাম ৩০-৪০ টাকায়। এখন কেজি কিনতে হয় ৮০-১০০ টাকায়। ড্রাগন ফল দোকানে দেখেছি। কখনো কিনে খাওয়া হয়নি। দোকানে নতুন নতুন ফল দেখি। দাম জিজ্ঞেস করার সাহস হয় না। দিনে দিনে নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে যাচ্ছে বাজারের সব মৌসুমী ফল।’
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য প্রত্যেক মানুষের অন্যান্য সবুজ শাকসবজির পাশাপাশি পর্যাপ্ত ফল খাওয়া দরকার। দেশীয় ফলে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন রয়েছে। যা শিশুদের সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে সাহায্য করে। গর্ভবতী মহিলাদের বেশি পরিমাণে আমিষ, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন, খনিজ পদার্থ সমৃদ্ধ খাবার এবং পর্যাপ্ত পানি খেতে হবে। না হলে শিশু অপুষ্টিতে ভুগবে। একজন মানুষকে সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পর্যাপ্ত পরিমানে সবুজ শাক-সবজি ও ফলমূল খেতে হবে কিন্তু নিম্ন আয়ের মানুষ ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের নাগালের বাইরে বাজারের অধিকাংশ ফল।
জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থাসহ অন্যান্য সংস্থা কর্তৃক প্রকাশিত বিশ্বে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি পরিস্থিতি ২০১৭ শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে ২০১০ থেকে ২০২০ এর মধ্যে অপুষ্টিজনিত সমস্যায় ভোগা মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ৭ লাখ। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার মতে, এমডিজি সময়কালে বাংলাদেশ খর্বতা, কৃশতা ও কম ওজন সম্পন্ন শিশুর সংখ্যা কমলেও বাংলাদেশে অপুষ্টির হার বিশ্বে সর্বোচ্চ। অপুষ্টির জন্য মৌসুমী ফল খেতে না পারাকে অন্যতম কারণ বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।
দেশে পুষ্টি পরিস্থিতির অগ্রগতি তেমন সন্তোষজনক নয়। শিশু ও নারীদের মধ্যে অপুষ্টির হার সবচেয়ে বেশি। তারা ভিটামিন-এ, আয়রন, আয়োডিন, জিংক ইত্যাদি ঘাটতিতে ভুগছে ব্যাপকভাবে। এছাড়া আছে রক্তস্বল্পতার সমস্যা। পুষ্টি বিষয়ক এক সমীক্ষা থেকে দেখা যায়, ৫ বছর পর্যন্ত শিশুদের শতকরা ৪৪ ভাগের মধ্যে জিংক ঘাটতি বিদ্যমান। অর্ধেকের বেশি মায়ের মধ্যে জিংক ঘাটতি আছে। এদের একটা বড় অংশ দারিদ্র্য পীড়িত এবং অনেকেই বস্তিতে বাস করে। শতকরা ৪০ ভাগের বেশি মায়ের আয়োডিন স্বল্পতা রয়েছে। এছাড়া শিশু, কিশোর-কিশোরী এবং মায়েদের ভিটামিনের ঘাটতিও উল্লেখযোগ্য।
চট্টগ্রামে প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে যুবক নিহতের ঘটনায় আটক- ২

