//এম মুরশীদ আলী//
তৃণমূলের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে গঠিত হয়েছিল উপজেলা পরিষদ। সরকারি নিয়মে সপ্তাহে ৫ দিন পূর্ণাঙ্গ দাপ্তরিক সেবা দেওয়ার কথা থাকলেও খুলনার রূপসা উপজেলায় চিত্রটি সম্পূর্ণ বিপরীত। রূপসা উপজেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণাধীন গুরুত্বপূর্ণ ১৭টি দপ্তরসহ ৩৩টি সরকারি দপ্তরের অধিকাংশই এখন অভিভাবকশূন্য। স্থায়ী কর্মকর্তার অভাবে অন্য উপজেলা থেকে ‘ধার-দেনা’ করে আনা অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কিংবা নিচের পদের কর্মচারীদের দিয়ে কোনোমতে জোড়াতালি দিয়ে চলছে কার্যক্রম। এতে সেবা নিতে এসে মাসের পর মাস চরম ভোগান্তি ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তর ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ টেবিলেই দায়িত্বপ্রাপ্ত শীর্ষ কর্তারা অনুপস্থিত। সেবাগ্রহীতারা কোনো কাজে দপ্তরে গেলে সহকারীরা মুখস্থ উত্তর ছুঁড়ে দেন ! ‘স্যার- জেলা অফিসে মিটিংয়ে আছেন’ অথবা ‘ট্রেনিংয়ে গেছেন’। সপ্তাহে পাঁচ দিন কর্মদিবস নির্ধারিত থাকলেও জেলা অফিসের কাজের বাহানায় অনেকেই এক থেকে দুই দিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকছেন। ফলে সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে ক্ষোভে ফুঁসছেন। স্থানীয়দের প্রশ্ন—উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এই ঢিলেঢালা উপস্থিতির বিষয়টি জেলা পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আদৌ তদারকি করেন কি না?
দপ্তরগুলোর বেহাল দশা ও জোড়াতালির প্রশাসন সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়: রূপসা উপজেলায় স্থায়ী সহকারী কমিশনার (ভূমি) নেই। তেরখাদা উপজেলার এসিল্যান্ড এস এম নুরুন্নবীকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যিনি সপ্তাহে মাত্র ২ দিন এখানে বসেন। ফলে ভূমিসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সেবা নিতে এসে মানুষ চরম বিড়ম্বনায় পড়ছেন।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতাল :
কর্মকর্তা ড. আহসান হাবীব প্রামাণিক পদোন্নতি পেয়ে গত ১৩ আগস্ট বদলি হন। এরপর থেকে বটিয়াঘাটা উপজেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. তরিকুল ইসলাম অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে সপ্তাহে মাত্র ২ দিন রূপসায় দায়িত্ব পালন করছেন। এতে করে খামারিরা সময়মতো সেবা পাচ্ছেন না।
উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিস:
সম্প্রতি ফকিরহাট উপজেলার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা অতিরিক্ত হিসেবে রূপসায় ২৮ দিন দায়িত্ব পালন করে গেছেন। এরপর দাকোপ উপজেলার কর্মকর্তা মো. মনিরুল ইসলামকে সপ্তাহে ২ দিনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর:
এখানকার প্রকৌশলী জয় প্রকাশ মজুমদার গত চার মাস ধরে প্রশিক্ষণে আছেন। তবে দীর্ঘদিনেও তাঁর স্থলে কোনো অতিরিক্ত কর্মকর্তা পদায়ন করা হয়নি। উপসহকারী প্রকৌশলী মো. রাসেল দায়িত্ব পালনে হিমশিম খাচ্ছেন ।
প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয়:
গ্রামীণ উন্নয়ন ও ত্রাণ কার্যক্রমের অন্যতম প্রধান এই কার্যালয়ে স্থায়ী কর্মকর্তা নেই। তেরখাদা উপজেলার পিআইও হানিফ শিকদার সপ্তাহে মাত্র ১ দিন এসে কোনোমতে ফাইল সই করছেন।
সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়: রূপসার সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার পদোন্নতি পেয়ে গত ৬ আগস্ট ভূমি উন্নয়ন প্রকল্প অটোমেশন অফিসে যোগদান করেন। এরপর ফুলতলা উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রার মো. তুষার আলমকে সপ্তাহে ২ দিনের জন্য অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। জমি রেজিস্ট্রেশন করতে এসে দূর-দূরান্তের মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন।
আইসিটি অধিদপ্তর:
উপজেলা আইসিটি কার্যালয়ের সহকারী প্রোগ্রামার মো. ইমরান হোসেনের বিরুদ্ধে নিয়মিত গড়হাজির থাকার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তাঁর অন্য কোনো উপজেলায় অতিরিক্ত দায়িত্ব না থাকলেও মাঝেমধ্যে তাকে অফিসে পাওয়া যায় না বলে ভুক্তভোগীর অভিযোগ।
উপজেলা ভূমি অফিস (সার্ভেয়ার) :
এই দপ্তরের সার্ভেয়ার জেলা অফিস থেকে সপ্তাহে মাত্র ২ দিন আসেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, সেই দুই দিনেও তাঁকে ঠিকমতো পাওয়া যায় না।
অন্য উপজেলায় দায়িত্ব পালন ও প্রশাসনিক সংকট। এদিকে রূপসার কর্মকর্তারাও অন্য উপজেলায় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করায় রূপসার অফিস ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রূপসা উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা অজিত কুমার ঘোষকে সপ্তাহে ২ দিন খুলনা খানজাহান আলী থানা কার্যালয়ে ডিউটি করতে হয়। ফলে রূপসার নির্ধারিত কর্মদিবসের দুই দিন তিনি অনুপস্থিত থাকেন। একইভাবে রূপসা উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা তারেক ইকবাল আজিজ সপ্তাহে ২ দিন অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন তেরখাদায়।
এদিকে রূপসা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা পরিষদ প্রশাসক—এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্বে আছেন সানজিদা রিক্তা। তিনি বর্তমানে বেশ কিছুটা অসুস্থ থাকলেও জনসেবা করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
অতিরিক্তরা রূপসা অফিসে সপ্তাহে কোনদিন থাকবেন, তা দপ্তরে নেই দিন-ক্ষন। এতে করে জনসাধারণ বিভিন্ন সেবায় ফলপ্রসু সেবা পাচ্ছেন বলে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় দেখা দিয়েছে। তাছাড়া কোন কোন দপ্তরের কর্মকর্তা সকাল ৯ টায় অফিস টাইম থাকলেও আসেন ১০ টার পরে এবং বিকাল ৪ টা পর্যন্ত অফিস করার সময় থাকলেও চলে যান চারটার পূর্বে। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে সেবাগ্রহীতারা এসে ফিরে যাচ্ছেন শূন্য হাতে।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার সানজিদা রিক্তা জানান, সময় মত অফিসে আসা এবং বিকাল ৪ টা পর্যন্ত অফিসে দায়িত্ব পালন করার ব্যাপারে নজর দেওয়া হবে এবং যেসব দপ্তরে কর্মকর্তা নাই তা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে অবহিত করা হয়েছে। অফিস শেষে গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলোতে দ্রুত স্থায়ী কর্মকর্তা পদায়ন করে উপজেলার সার্বিক প্রশাসনিক স্থবিরতা কাটানোর জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন রূপসাবাসী।

