গত ০৮ মার্চ-২০২০ বাংলাদেশে সর্বপ্রথম বাংলাদেশে করোনা রোগী সনাক্ত হয়।প্রথম করোনা রোগী সনাক্তের পর দেশের সকল জনগণের ভিতর যে ভয়ভীতি পরিলক্ষিত হয় সময়ের সাথে সাথে তার অনেক পরিবর্তন হয়েছে।গতবছর দেখেছি নিজের সন্তান করোনা আক্রান্ত মাকে জঙ্গলে ফেলে গিয়েছে, স্ত্রী তার করোনা আক্রান্ত স্বামীকে ফেলে ছেলেমেয়ে নিয়ে বাপের বাড়িতে চলে গিয়েছে ।
আবার যদি কেউ করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছে তাহলে পরিবারের কেউ লাশ পর্যন্ত নিতে আসেনি।এমনি কি দাফন করার জন্য পুলিশ ও কতিপয় কিছু মানবিক গুণ সম্পন্ন করোনা যুদ্ধা ছাড়া কাউকে পাওয়া যায়নি। তখন মনে হয়েছিল হয়তো মনুষ্যত্ববোধ মনে হয় চলেই গিয়েছে।কিন্তু না এবছর মানবিকতার কিছু অন্যন্য নজিরও চোখে পড়েছে যেমন- বরিশালে ছেলে নিজের শরীরে অক্সিজেন সিলিন্ডার বেঁধে মোটরসাইকেলে করোনা আক্রান্ত মাকে নিয়ে হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ্য করে নিয়ে বাড়ি ফিরছে এবং দাফন নিয়ে যে ভয়ভীতি ছিল তাও দূর হয়েছে। করোনার সম্মূখ সারীর যুদ্ধা হিসাবে ডাক্তার, নার্স,স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা- কর্মচারী,বাংলাদেশ পুলিশ প্রশাসনের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ,রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন কিছু বেসরকারি সংস্থা এবং সেবামূলক প্রতিষ্ঠান যুক্ত ছিল।

কিন্তু এবছর রোগীর সেবা করতে সাধারণ মানুষেরও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।তেমনি আমরা সমাজের মানুষ যাদের অনেকটাই তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের চোখে দেখি,মানুষ হিসাবে স্বীকৃতি দিতেও দ্বিধা করি সেই তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ এবং তাদের গঠিত সংগঠন “ বৃহন্নলা” ও স্বমহিমায় এগিয়ে এসেছে করোনায় আক্রান্ত রোগীদের সেবা দিতে।
এই সংগঠনের তিন-চার সদস্য কাজ করছে ঢাকা মেডিকেল কলেজের করোনা ইউনিটের সামনে। করোনা রোগী নিয়ে কোন অ্যাম্বুলেন্স থামতেই কমলা রঙের জ্যাকেট পরা ৩/৪ জন মানুষপ্লেকার্ড নিয়ে ছুটে আসে এবং ধরাধরি করে করোনা রোগীকে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামায়।কেউ হাতে তুলে নেয় রোগীর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।আবার কেউবা রোগীকে স্ট্রেচারে বসিয়ে নিয়ে যায় হাসপাতালে। এরা সবাই আমাদের কাছের মানুষ,আমাদেরই সমগোত্রীয় কিন্তু জেন্ডার গত সমস্যার জন্য আমাদের কাছে,আমাদের সমাজের কাছে অবহেলিত, নিষ্পেষিত।সামাজিক সুবিধা বঞ্চিত তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ,যাদের আমরা কটাক্ষ করে বলি হিজড়া।
এরা সকলে এদের গঠিত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন “ বৃহন্নলা”- এর স্বেচ্ছাসেবক। করোনার সম্মূখসারির যুদ্ধা হয়ে কাজ করা মানুষ মুনমুন, রুহী ও চাঁদনী এবং তাদের সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সাদিকুল ইসলাম। করোনা আক্রান্ত রোগীকে যেখানে আত্মীয় স্বজনরা বয়কট করছে।আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া মানুষটির নিকটে আসছে না সেখানে “ বৃহন্নলা” – এর তৃতীয় লিঙ্গের মানুষগুলো পরম মমতায়,আদরে ও যত্নে কাছে থেকে সেবাযত্ন করছে, সাহস যোগাচ্ছে এর থেকে আর বড় প্রাপ্তি একজন করোনার রোগীর জন্য কি হতে পারে? আর তাই তো মনে হয়- ” তোমরা কে বল আমায় অভিশাপ দিয়েছো আমি না হয় বৃহন্নলা হয়ে অজ্ঞাত বাসে কাটিয়ে দেব সারাটা জীবন। ” – একথা বলার দিন হয়তো শেষ হয়ে এসেছে ।
সময় এসেছে পারিবারিক,সমাজিক ও রাষ্ট্রীয় দৃষ্টি ভঙ্গি পরিবর্তনের। সময় এসেছে রাষ্ট্রীয়ভাবে এই বৃহন্নলাদের মৌলিক অধিকার সমূহ বাস্তবায়নের। আর সমাজের এই পিছিয়ে পড়া অংশকে যদি মূল স্রোতধারায় সম্পৃক্ত করা না যায় তাহলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন অনেকাংশে বিঘ্নিত হবে।সুযোগ ও সহযোগীতা পেলে এই তৃতীয় লিঙ্গের মানুষগুলোও আমাদের সমাজের জন্য, দেশের জন্য অনেক কিছু করতে পারে তার অনেকগুলো দৃষ্টান্ত ইতিমধ্যেই তারা স্থাপন করেছেন।
// স্বীকৃতি বিশ্বাস, নিজস্ব প্রতিবেদক //
