পরিস্কার পানিতে এডিস মশায় বিষ ! রূপসায় চিকিৎসক সংকট হাসপাতালে বাড়ছে রোগী; স্কুলছাত্রীসহ ৪ জনের মৃত্যু, কীট পরীক্ষায় বঞ্চিত পাবলিক

পরিস্কার পানিতে এডিস মশায় বিষ ! রূপসায় চিকিৎসক সংকট হাসপাতালে বাড়ছে রোগী; স্কুলছাত্রীসহ ৪ জনের মৃত্যু, কীট পরীক্ষায় বঞ্চিত পাবলিক

// এম মুরশীদ আলী //

হাসপাতালে রোগীর ভীড় দেখে বোঝা যাচ্ছে কোভিড-১৯ এর মত ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা। ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত রোগ যা এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়। এ লক্ষ্যে ঘরে ঘরে জ্বর, সর্দি-কাশি দেখা দিলেই চিকিৎসক ডেঙ্গু পরীক্ষার পরামর্শ দেন। এতে সামান্য জ্বর অসুস্থদের ভিতর ডেঙ্গুর ভয়-ভয় লাগলেও পরীক্ষা ছাড়া চিকিৎসা নেই।

রূপসায় আশঙ্কাজনক হারে ডেঙ্গু জ্বরের কারণ হচ্ছে- বর্ষা মৌসুমে থেমে থেমে বৃষ্টি এবং বৃষ্টির পানি ঘরের আশপাশে ফেলে দেওয়া পাত্র, ফুলের টব, ড্রাম, পরিত্যক্ত টায়ার ইত্যাদি এ সকল স্থানে পরিষ্কার পানি জমে এডিস মশার ডিম থেকে প্রজন্ম বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই এডিস মশার কামড়ের বিষাক্ত বিষের তেজস্ক্রিয়তা মানুষের শরীরের ছড়িয়ে- মাথায় যন্ত্রণা, গিরেই-গিরেই ব্যথা, পেটে পানি জমা সহ তীব্র তাপদাহে জ্বরের সৃষ্টি। শরীরের ঐবিষ নিস্ক্রিয় হতে জ্বর থাকে ৭ দিনের মত, আর শরীরের পূর্ণ স্বাভাবিক হতে ১৫ থেকে ২০ দিনেরও বেশি সময় ক্লান্ত ক্লান্তিভাবে ভোগতে হয়। অন্যদিকে বেশ কিছু আক্রান্ত রোগী চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে জানা যায়। ডেঙ্গু আক্রান্তের নেই কোন বয়সের সীমা, ছোট্ট বাচ্চা থেকে বৃদ্ধ, তাছাড়া নার্স, ডাক্তারও আক্রান্ত হতে দেখা যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে দিনে ও রাতে ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার এবং সামান্য জ্বর অনুভূত হলেই দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক হয়।

পরিস্কার পানিতে এডিস মশায় বিষ ! রূপসায় চিকিৎসক সংকট হাসপাতালে বাড়ছে রোগী; স্কুলছাত্রীসহ ৪ জনের মৃত্যু, কীট পরীক্ষায় বঞ্চিত পাবলিক

ইতিমধ্যে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে রূপসার ঘাটভোগ ইউনিয়ন ধোপাখোলা গ্রামের যুবক দেব বিশ্বাস, খাজাডাঙ্গা গ্রামের স্কুলছাত্রী নাসিমা খাতুন এবং ভবানীপুর গ্রামের দুজনের মৃত্যু হয়েছে।

খুলনা জেলার ৯ টি উপজেলার মধ্যে রূপসা উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে। রূপসায় ৫ টি ইউনিয়নের মধ্যে নৈহাটি ইউনিয়নের গ্ৰামগুলির মানুষ বেশি আক্রান্ত হতে দেখা যাচ্ছে। কারন- জনবল বেশি, ঘনত্ব বসবাস, শ্রমিক এলাকায় সচেতনতার অভাব ইত্যাদি কারণে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ব্যাপক হারে বেড়ে উঠায় এলাকাগুলো এডিস মশার হটস্পট হয়ে উঠেছে। অবহেলিত রূপসার অনেক জায়গায়ই মশক নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো জনবল, যন্ত্র ও বাজেট নেই।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে রূপসায় আগস্ট, সেপ্টেম্বর থেকেও অক্টোবর আরো ভয়াবহ পরিস্থিতি রুপ নিতে পারে। এডিস মশার কামড়ে আক্রান্ত মানুষ প্রাণ হারালেও মশক নিধনে কার্যকর উদ্যোগের অভাব, অপরিকল্পিত রূপসা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাইরে চলে যেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। সিজনাল জ্বর থেকে সুস্থ হতে ঔষধের খরচ তেমন একটা নেই। কিন্তু ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হলে সুস্থ হতে খরচ হচ্ছে ২ থেকে আড়াই হাজার টাকার মতো।

হাসপাতাল সূত্র জানা যায়, বছরের শুরু থেকে দেখা দিয়েছে ডেঙ্গু আক্রান্ত। এ বছর হাসপাতালে ৬৩১ জন ডেঙ্গু রোগীর ভর্তি ও  চিকিৎসা নেই। আর কীট পরীক্ষা ১৬৪৯টি দেওয়া হয়েছে। যেমন- জানুয়ারি মাসে ৩ জন, ফেব্রুয়ারি মাসে ২ জন, মার্চ ও এপ্রিলে মাসে ভর্তি নেই, মে মাসে ১০ জন, জুন মাসে ৪১ জন, জুলাই মাসে ৮১ জন, আগষ্ট মাসে ২৫০ জন, সেপ্টেম্বর মাসে ২৫৯ জন। সর্বমোট এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ৬৩১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৩৬৪ জন এবং নারী ২৫৯ জন, শিশু ৮ জন।

আক্রান্তদের জন্য হাসপাতালে ফ্রী কীট স্বল্পতা থাকায় প্রতিদিন ২০-২৫ জনকে দেওয়া হয়। যেমন- মার্চ মাসে ১৪ টি, এপ্রিল মাসে ১২ টি, মে মাসে ৭টি, জুন মাসে নেই, জুলাই মাসে ১১৮টি, আগষ্ট মাসে ৭১০ টি, সেপ্টেম্বর মাসে ৭৮৮ টি। সর্বমোট ১৬৪৯টি কীট পরীক্ষা ফ্রী করা হয়েছে।

এই জরুরি মূহুর্তে রূপসায় বেসরকারি হাসপাতাল সিএসএস রেভা আব্দুল মেমোরিয়াল হাসপাতালে আংশিক রোগীর টিটমেন্ট ব্যতীত সরকারি-হাসপাতালে রোগীর চাপ অতিরিক্ত মাত্রায় বেড়েছে। ইতিমধ্যে সরকারি এ হাসপাতালে বিভিন্ন গ্ৰাম থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হচ্ছে। হঠাৎ করে রোগী চাপে চিকিৎসা ব্যবস্থায় অতিরিক্ত ডিউটিতে হিমশিম।

এ ব্যাপারে আবাসিক মেডিকেল অফিসার (R.M.O) ডাঃ খন্দকার এহসান হিমেল জানান, রূপসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৫০ শয্যা বিশিষ্ট। এখানে সর্বোচ্চ ৫০ জন রোগীর জন্য ৩ শিফট মিলে ৪১ জন চিকিৎসকের মধ্যে ১২ জন বিশেষজ্ঞ এবং ২৩ জন মেডিকেল অফিসার থাকার কথা। সেখানে আছে ৬ জন বিশেষজ্ঞ এবং ১০ জন মেডিকেল অফিসার। আর স্বাস্থ্য সেবী/নার্স ৩০ জনের মধ্যে আছে ২৮ জন। হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা হয় ৮০ থেকে ১০০রও অধিক, এ রোগীদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খেতে হয়। এরমধ্যে ডেঙ্গু জ্বরের পাশাপাশি হাম-রুবেলা, টাইফয়েট জ্বর, সিজনাল জ্বর, পাতলা পায়খানা, হিটস্ট্রোক, নিউমোনিয়া ইত্যাদি রোগের চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর গড়িয়েও হাসপাতালে ৩ টাকার সিলিপে ব্যাপক ভীড়ে বিভিন্ন রোগীর চিকিৎসা শেষে ভর্তি রোগীদের সেবাতো চলমান থেকে যায়।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মাজেদুল হক কাউসার বলেন- জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ল্যাবরেটরিতে প্রতিদিন ৫০-৬০ জন রোগী ফ্রি ডেঙ্গু পরীক্ষা জন্য আসে, কিন্তু কীট স্বল্পতা থাকায় মাত্র ২৫ জন রোগী ডেঙ্গু পরীক্ষা সুযোগ পাচ্ছেন। বাকি ২৫-৩০ জন রোগী বাহিরে পরীক্ষায় যেতে হচ্ছে। কারণ- কর্তৃপক্ষ পর্যাপ্ত ডেঙ্গু কীট সরবরাহ না করায় রোগীদের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

ডেঙ্গু রোগীর জন্য ৩ ধরনের পরীক্ষা আবশ্যই:

যেমন-  ১. (এন এস-১) ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ফ্রী করেছে সরকার। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১২৩৬ টি পরীক্ষা করা হয়েছে।

২. (আই জি জি এবং আই জি এম) ৫৯০ টি পরীক্ষা স্বল্প মূল্য ৫০ টাকা করে নিয়ে দেওয়া হয়েছে।

৩. সি বি সি সেলকাউন্ড ৪/৫ বার টেষ্ট করানো লাগে।

এটা বেসরকারিভাবে রোগীকে বাহিরে করতে হচ্ছে, আপাতত সাপ্লাই নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *