//নিজস্ব প্রতিবেদক//
মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপু ও কলেজছাত্রী সামিয়া আফনান প্রীতি নিহত হয়েছেন যার গুলিতে সে এখন গোয়েন্দাদের জালে। ঢাকা মহানগর পুলিশের একটি টিম তার নাম-পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর একাধিক জায়গায় অভিযান চালিয়েছে। সোর্স ও প্রযুক্তিগত তদন্তের মাধ্যমে শাহজাহানপুরে জোড়া খুনে জড়িত ওই শুটারকে শনাক্ত করা হয়। এর পরই তাকে দ্রুত গ্রেপ্তার করতে একাধিক টিম মাঠে নামে। চাঞ্চল্যকর হত্যার পরিকল্পনা থেকে শুরু করে মাঠে বাস্তবায়ন পর্যন্ত যারা যে প্রক্রিয়ায় ছিল তাদের নেটওয়ার্ক সম্পর্কে ধারণা পেয়েছেন গোয়েন্দারা। পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা গতকাল সমকালকে এই তথ্য জানান। তবে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের আগে শুটারের নাম-পরিচয় ও হত্যার মোটিভ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি ওই কর্মকর্তা। যদিও দীর্ঘদিন ঢাকায় ফিল্মি কায়দায় এমন হত্যাকাণ্ডের পর নানামুখী তথ্য সামনে আসছে।
তদন্তের অগ্রগতির ব্যাপারে জানতে চাইলে ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, শুধু এটুকু বলব, দু-এক দিনের মধ্যে হত্যার ব্যাপারে সবকিছু জানাতে পারব। আমাদের টিম কাজও করছে। তদন্তে বেশ অগ্রগতিও আছে।
আওয়ামী লীগ নেতা টিপুর স্ত্রী ১, ১১, ১২ নম্বর ওয়ার্ডের নারী কাউন্সিলর ফারহানা ইসলাম ডলি সমকালকে বলেন, স্বামীর খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। কারও প্রতি আমার সুনির্দিষ্ট সন্দেহ নেই। আওয়ামী লীগ বড় সংগঠন। টুকটাক গ্রুপিং তো থাকেই। হয়তো টিপুর জনপ্রিয়তা তার জন্য কাল হয়েছে। দলের প্রতি সে নিবেদিত ছিল। হুমকি পাওয়ার পর সে ভাবতে পারেনি, কেউ তাকে সত্যি সত্যি হত্যা করতে পারে। হুমকির বিষয়টিকে সেভাবে গুরুত্বও দেয়নি। আমাকেও হুমকির কথা বলেছিল। স্বামীকে হারিয়েছি, বিধবা হয়েছি। মাথার ওপর আর কেউ রইল না।
ডলি আরও বলেন, ক্রীড়া পরিষদ বা অন্য দপ্তরের কাজ নিয়ে টিপুর সঙ্গে কারও দ্বন্দ্ব ছিল, এটা আমার জানা নেই।
মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি বশিরুল আলম খান বাবুল বলেন, মতিঝিলে আওয়ামী লীগের মধ্যে বড় ধরনের কোনো কোন্দল নেই। এক সময় মিল্ক্কী ও তারেকের আলাদা গ্রুপ ছিল। এলাকায় কাঁচা টাকা আছে। এসবের পেছনে তো অনেকে দৌড়ায়। আবার অনেকে ফিরেও তাকায় না। মিল্ক্কী হত্যার পর থেকে সংগঠনে টিপুর পদ নেই। তবে দল থেকে তাকে বহিস্কার করা হয়নি। টিপু তার লোকজন নিয়ে ক্রীড়া পরিষদের ঠিকাদারি করত। তার লোকজন নিয়ে আইডিয়াল স্কুল নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। ওই স্কুলে ভর্তি, শিক্ষক নিয়োগসহ কত ধরনের বাণিজ্য হয়।
আগে সুধী সমাজের লোকজন পরিচালনা কমিটিতে আসত। এখন সেই রেওয়াজ নেই। মুক্তিযোদ্ধাদের নামে এজিবি কলোনিতে একটি মার্কেট তৈরি করা হয়েছে। প্রতিটি দোকান থেকে কয়েক লাখ টাকা তোলা হয়। এই কাজে টিপু ও তার লোকজন জড়িত। ওই মার্কেট নিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ছিল। কালো আর কাঁচা টাকা যেখানে, রক্তপাত সেখানে হতেই পারে। কারও সঙ্গে হয়তো স্বার্থের কোনো সূক্ষ্ণ দ্বন্দ্বও থাকতেও পারে। তবে রাজনৈতিক বিরোধে এই খুনের ঘটনা, এটা মনে হয় না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বের করুক আসলে কী কারণে খুন হলো। হত্যার ধরন বলছে, এটা নরমাল মাস্তানদের কাজ নয়।
বশিরুল আলম আরও বলেন, এলাকায় শান্তি চাই। মাদকমুক্ত হোক, এটাও চাওয়া। আর আমরা একা চাইলেই তো হবে না। পুলিশকেও ভূমিকা রাখতে হবে। তবে এটা ঠিক, এলাকার পরিবেশ অনেক খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
মতিঝিল ও শাহজাহানপুরের আরও একাধিক রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টিপু হত্যার পর এলাকায় ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। ২০১৩ সালের ২৯ জুলাই যুবলীগ দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজুল হক মিল্ক্কীকে হত্যা করা হয়। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে মিল্ক্কীর ঘনিষ্ঠ যুবলীগ কর্মী রিজভী হাসান বাবু ওরফে বোছা বাবুও হত্যার শিকার হন। এবার খুন হলেন টিপু। অনেকের প্রশ্ন এরপর কে? অনেক দিন পরপর হলেও রাজনীতির সঙ্গে জড়িতদের হত্যার এই ধারা নিয়ে এলাকার অনেকে শঙ্কিত।
তদন্ত সংশ্নিষ্ট পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, জোড়া খুনের ঘটনার রহস্য উন্মোচনে তদন্তকে কয়েকটি ধাপে ভাগ করে তারা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। মোটরসাইকেলে এসে যে ব্যক্তি গুলি করেছিল, প্রথমে তাকে শনাক্ত করতে নানামুখী তৎপরতা চলতে থাকে। এরপর তার সহযোগীকে খোঁজা হয়। মোটরসাইকেলে আসা শুটার ও তার সহযোগী ছাড়াও কে বা কারা তাদের ভাড়া করেছিল, তাদের নাম-পরিচয় জানার কাজ শুরু হয়। মূল শুটারের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর কোথায় সে গা-ঢাকা দিয়েছে সেই তথ্য জানার চেষ্টা করেন গোয়েন্দারা। এরপর চলছে ধারাবাহিক অভিযান।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, ঘটনার পর থেকে তদন্ত সংশ্নিষ্টদের অনেকে বাসায় যাননি। বাইরে তদন্ত শেষে আবার অফিসেই তারা অবস্থান করছেন। খুনি শনাক্তকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন তারা। চার-পাঁচজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তাদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে।
বৃহস্পতিবার রাতে বাসার অদূরে উত্তর শাহজাহানপুর রেললাইন সংলগ্ন সড়কে গাড়িতে বসা টিপুকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ সময় গুলিতে মর্মন্তুদ মৃত্যু হয় নিরীহ রিকশাযাত্রী কলেজছাত্রী সামিয়া আফনান প্রীতির। গুলিতে আহত হয়েছেন টিপুর গাড়িচালক মনির হোসেন মুন্না। সিসিটিভির ফুটেজে দেখা যায়, মোটরসাইকেল থেকে নেমে এক ব্যক্তি টিপুর গাড়ির পাশে এসে বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি করে। শুটারের আরেক সহযোগী রাস্তার উল্টো পাশে অপেক্ষা করছিল। পুলিশ বলছে, ওই মোটরসাইকেলের কিছু তথ্য তাদের হাতে এসেছে।
জানা গেছে, হত্যার পর টিপুর গাড়িতে যে দু’জন ছিলেন তাদের একজন যুবলীগ কর্মী রিজভী হাসান বাবু ওরফে বোছা বাবুর বাবা মো. কালাম হাসান ওরফে কালা। বাবু ২০১৬ সালে খুন হন। গাড়িতে থাকা আরেকজন হলেন মিজানুর রহমান মিরাজ। দুবাইয়ে থাকা সন্ত্রাসী জিসানের মামাশ্বশুর মিরাজ। তবে এলাকাবাসী বলছেন, কালাম ও মিরাজ এলাকায় কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত নন।
এজিবি কলোনি ঘুরে দেখা যায়, সব জায়গায় টিপুর নামে অনেক পোস্টার। এলাকাবাসীও বলছেন, কমিটিতে না থাকলেও এলাকায় তার প্রভাব ছিল। হত্যার পর পুলিশ ওই এলাকা থেকে চারজনকে ধরে নিয়ে গেছে, এমনও বলেছেন কেউ কেউ। বৃহস্পতিবার রাতে এজিবি কলোনির রেস্টুরেন্ট থেকে টিপু বের হওয়ার আগেই ওই এলাকায় দুটি রহস্যজনক মোটরসাইকেল চক্কর দিতে দেখেছেন এলাকার বাসিন্দারা। পুলিশ কয়েকটি দোকান ও বাসা থেকে সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে ওই দুই মোটরসাইকেলের ব্যাপারে তদন্ত শুরু করে। তবে ঘটনার পর থেকেই এজিবি কলোনি ও আশপাশের এলাকায় চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে।
‘নাটের গুরুদে’র বের করা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, টিপু হত্যার রহস্য দ্রুত উদ্ঘাটন করা হবে। তদন্ত চলছে, হত্যাকাে র পেছনে কারা জড়িত, নাটের গুরু কারা সবকিছুই গণমাধ্যমের মাধ্যমে দেশবাসীর সামনে নিয়ে আসা হবে। যারাই এ ঘটনায় জড়িত থাকুক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। গতকাল অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। এটি রাজনৈতিক হত্যাকা কিনা- এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, কিলিং পলিটিক্যাল কিনা, সেই বিষয়ে এখনই মন্তব্য করতে চাই না। খুব শিগগির এ হত্যাকাে র রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারব। সমকাল
ইউক্রেনে কত হাজার ভবন ধ্বংস করেছে রাশিয়া, জেনে নিন
স্টাইলিস্ট কিম জং ক্ষেপনাস্ত্র পরীক্ষাও চালালেন ফিল্মি স্টাইলে

