ভবদহের জলাবদ্ধতায় শারদীয় দুর্গোৎসবে নেই কোন উৎসবের আমেজ

ভবদহের জলাবদ্ধতায় শারদীয় দুর্গোৎসবে নেই কোন উৎসবের আমেজ

ভোরের আলোয় দুর্বাঘাস ও  সোনালী ধানের ডগায় জমে থাকা শিশির বিন্দুর উজ্জ্বল্যতা,শিউলি তলায় পড়ে থাকা ফুলের সুগন্ধ আর নদীর কূলে ফুটে থাকা কাশফুলের হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসা মনকে করে তোলে বিরহী ও ব্যাকুল। শরতের নীল আকাশে ভেসে থাকা শুভ্র সাদা মেঘের ভেলা যেমন হৃদয়কে আন্দোলিত করে তেমনি ভিতরে ভিতরে কিছু একটা পাওয়া ও না পাওয়ার দোলাচল মনকে করে তোলে ব্যাকুল। ফলে ঋতু প্রকৃতির এই অপরূপ রূপ-সৌন্দর্যের আরাধনায় সকল মানুষ হয়ে উঠে ব্যাকুল।

পৃথিবীর এমনই এক সুন্দর মনমোহিনী রূপের সৌন্দর্য প্রাণ- মনে চাঞ্চল সৃষ্টি করে। আর এই চঞ্চল্য মনকে একটু প্রশান্তি দেওয়ার জন্য স্বর্গলোক থেকে মর্তলোকে আর্বিভূত হয় জগত জননী দুর্গা মাতা। যার প্রভাবে সার্বজনীনতা লাভ করে পৃথিবীর মানুষকে করে তোলে  মাতোয়ারা।  যা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব “শারদীয় দুর্গোৎসব” নামে অবিহিত।

পৃথিবীর যে প্রান্তেই সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বাস করেন না কেন তাদের মনের  ভিতর শারদ উৎসবকে কেন্দ্র করে একটা উৎসাহ উদ্দীপনা কাজ করে। এই উৎসব উপলক্ষে প্রতিটি মা- বাবা সাধ্যমত তার সন্তানদের নতুন জামা,কাপড়,জুতা কিনে দেন ঠিকই একইভাবে আশেপাশে বসবাসরত গরীব-দুঃখীসহ আপামর জনগণকে কাপড়- চোপড়সহ ভালমন্দ খাবারের ব্যবস্থা করে দেন।পূজা মানে সম্প্রীতি, পূজা মানে সৌহার্দ্য, পূজা মানে দেশ-বিদেশে অবস্থানরত সকলে একত্রে মিলিত হয়ে  কয়েকটি  দিন পূজার্চ্চনা,অঞ্জলি দেয়া, নাচ,গান, আরতি,সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান,যাত্রাপালাসহ হইহুল্লোড়,আনন্দ,উৎসাহের মধ্যে কাটানো এবং পূজা শেষে দুঃখ ভরাক্রান্ত মন নিয়ে আগামী বছরের অপেক্ষা নিয়ে  স্বস্ব  স্থানে ফিরে যাওয়া।

কিন্তু  সর্ববৃহৎ শারদীয় দুর্গোৎসবের পূর্বে  ও পরে ব্যাতিক্রমী ছবি দেখতে পাওয়া যাবে যশোর জেলার অভয়নগর, মনিরামপুর, কেশবপুরসহ পার্শ্ববতী  আরও ২ টি উপজেলার হিন্দু অধ্যুষিত ৯৬ টি গ্রামে। কারণ ভবদহের জলাবদ্ধতায় ৮০ টি গ্রামের কয়েক হাজার পরিবার,অর্ধশতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান,মন্দির,মসজিদ ও দাফনের গোরস্থান এবং শশ্মানঘাট আক্রান্ত।ফলে সামাজিক জীবনযাপন,শিক্ষা ব্যবস্থা,ধর্মীয় অনুষ্ঠানসহ মৃত মানুষের  দাফন নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম সংকট।

এলাকার অধিকাংশেরই বাড়ির উঠানে হাঁটু সমান পানি আবার অনেকের থাকার ঘর ও রান্নাঘরের মধ্যে পানি বিধায় উপায়ন্তর না পেয়ে নিজস্ব ঘরবাড়ি ফেলে পথের ধারে টিনের ছাবড়া তৈরি করে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মা-বাবা, ছেলে,ছেলের বউসহ গরুছাগল নিয়ে একই ঘরে বাস করছেন ও রান্নাবান্না করে খেয়ে না খেয়ে কোন রকমে জীবিকা নির্বাহ করছেন।তাদের প্রসাব- পায়খানা  সারার কোন নির্দিষ্ট জায়গা না থাকায় বাঁশদিয়ে ভাসমান পায়খানা তৈরি করে পানির উপরেরই সারছেন।ফলে চারিপাশের পরিবেশ যেমন নোংরা হচ্ছে তেমনি পানিবাহিত রোগজীবানুও ছড়াচ্ছে।

আরেক শ্রেণীর জনগণ  যাদের পক্ষে বাঁশের সাঁকো তৈরি করা সম্ভব তারা নিজেদের বাড়িতে অবস্থান করছেন কিন্তু

থাকার ঘর, রান্নাঘর,গোয়ালঘরে পানি, একঘর থেকে অন্যঘরে যেতে ব্যবহার করতে হয় বাঁশের তৈরি সাঁকো।পায়খানা প্রসাব করার পাকা বা আধাপাকা পায়খানায় পানি উঠায় ব্যবহার করার পর মলমূত্র ভেসে থাকছে। আর এর উপর মশামাছি বসে বসবাসের অনুপযোগী করে তুলছে চারিপাশের পরিবেশ।ঘরে মানুষের যেমন খাবার নেই তেমনি গৃহপালিত পশুদেরও খাবার নেই ও পান করার জন্য বিশুদ্ধ পানি নেই এবং পয়ঃনিষ্কাশনের কোন ব্যবস্থা নেই।শুধু নেই আর নেই।

চারিদিকে পানি থাকায় একদিকে ছোট শিশুরা যেমন নিরাপত্তা হীনতায় ভুগছে তেমনি বয়োঃবৃদ্ধ লোকেরাও পড়েছে মহা যন্ত্রণায়। ইতিমধ্যে পানিতে পড়ে ২ মহিলা মৃত্যু বরণ করেছেন। আগামীতে পানি বাহিত রোগের সাথে সাথে অন্যান্য অসংক্রমণ রোগেও মৃত্যুর হার বেড়ে যাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

এমনই একটা দুঃসময়ে পালিত হতে যাচ্ছে হিন্দু সম্প্রদায়ের সর্ববৃহত ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা।যেখানে ঘরে খাবার নেই, বাসস্থানের কোন নিরাপদ ব্যবস্থা নেই,চিকিৎসার কোন সুযোগ নেই, স্বাভাবিক মৃত্যুর কোন নিশ্চয়তা নেই তখন কিভাবে শিশুদের নতুন জামা- কাপড়,জুতা কিনে দিবে? অনেকে যদিও বা শিশুদের নতুন পোশাক কিনে দিতে পারছেন কিন্তু এই  অনিরাপদ পরিবেশে কিভাবে শিশুদের পূজায় নিয়ে যাবেন।যেকোন ধর্মীয় উৎসবের মূলমন্ত্র সার্বজনীনতা।যেহেতু এবারের দুর্গোৎসবে সার্বজননীতা থাকছে না তাই এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব অনেকটাই ফিকে হয়ে গিয়েছে ভবদহ এলাকার জনগণের নিকটে।

ভবদহ এলাকার জনগণের এমন দুঃসময়ে এখনও কোন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি,সরকার- বেসরকারি সংস্থা  সাহায্য সহযোগিতার করার হাত বাড়িয়ে দেয়নি।ফলে স্থানীয়দের ভিতর একটা চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।ভবদহ এলাকার জনগণকে বিভিন্ন রক্ষার জন্য এখন ত্রান সামগ্রী বিতরণ করা, পানিবাহিত রোগ থেকে রক্ষার জন্য বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা ও পয়ঃনিষ্কাশনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা প্রয়োজন।আর তা না হলে চরম মানবিক বিপর্যয় দেখা দিবে।

//স্বীকৃতি বিশ্বাস, নিজস্ব প্রতিবেদক//

পড়ুন দৈনিক বিশ্ব …

রামপালে ৩৯টি মণ্ডপে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *