//এম মুরশীদ আলী, খুলনা//
খুলনা জেলা প্রশাসক ও বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিজ্ হুরে জান্নাত বলেছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসা নিশ্চিত করলেই হবে না, এর আগেই ডেঙ্গুর সম্ভাব্য উৎস ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এ জন্য জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্বাস্থ্য বিভাগ, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন। ডেঙ্গু প্রতিরোধে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিতভাবে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে কোথায় পানি জমে আছে, কোথায় মশার প্রজননের তৈরি হচ্ছে এবং কোন এলাকাগুলোতে ঝুঁকি বেশি, এসব বিষয় চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না, অভিযান পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি কতটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে, সেটিও নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ডেঙ্গু প্রতিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাড়ির আঙিনা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি অফিস, বাজার, সড়কের পাশসহ যেসব স্থানে পানি জমে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, সেসব স্থান নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা পাত্র, টায়ার, ডাবের খোসা, প্লাস্টিকের পাত্র কিংবা অন্য কোনো বস্তুতে পানি জমে থাকলে সেগুলো অপসারণ করতে হবে। নিজ নিজ অবস্থান থেকে মানুষ যদি এসব বিষয়ে সচেতন হয়, তাহলে ডেঙ্গুর প্রজননস্থল অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধে চলমান কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ, স্বাস্থ্য বিভাগ, কৃষি বিভাগ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোকে পারস্পরিক সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করতে হবে। কোন এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে দ্রুত সেই এলাকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা তৈরির কোনো বিকল্প নেই। সাধারণ মানুষকে ডেঙ্গুর লক্ষণ, মশার প্রজননস্থল এবং প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে জানাতে নিয়মিত প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। একই সঙ্গে জ্বর বা ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। তবে ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ারও প্রয়োজন নেই; সচেতনতা, সময়মতো চিকিৎসা এবং সম্মিলিত প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব। প্রশাসন মাঠপর্যায়ে যে কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তার সঙ্গে জনগণের অংশগ্রহণ যুক্ত হলে উদ্যোগগুলো আরও ফলপ্রসূ হবে। ডেঙ্গু একটি মশাবাহিত রোগ, তাই এর নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য বিভাগের চিকিৎসা কার্যক্রমের পাশাপাশি পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের বিষয়টি সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। কোথাও কোনো সমস্যা দেখা দিলে স্থানীয় পর্যায় থেকে দ্রুত তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধ একটি চলমান কার্যক্রম। এটি কোনো নির্দিষ্ট সময়ের অভিযান নয়। বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে নিয়মিতভাবে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিতকরণ, জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও স্থানীয় পর্যায়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও স্বাস্থ্য বিভাগের পাশাপাশি শিক্ষক, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ নাগরিক সবার দায়িত্ব রয়েছে। প্রত্যেকে নিজের বাড়ি, প্রতিষ্ঠান ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখলে এবং অন্যদেরও সচেতন করলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমানো সম্ভব। তাই আতঙ্ক নয়, সম্মিলিত উদ্যোগ ও দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমেই ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর ফলাফল নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি গত ২৪ সেপ্টেম্বর সকালে রূপসা উপজেলার টিএসবি ইউনিয়ন পরিষদ আয়োজিত ডেঙ্গু মশাবাহিত ও অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে সমন্বিত কার্যক্রম, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও সচেতনতামূলক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন রূপসা উপজেলা নির্বাহী অফিসার সানজিদা রিকতা। বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন সহকারী কমিশনার ভূমি (অতিরিক্ত) এস এম নুরুন্নবী, জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার মেহেদী হাসান, রূপসা থানা অফিসার ইনচার্জ তদন্ত মোহাম্মদ আব্দুস সবুর খান, টিএসবি ইউনিয়ন পরিষদ ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. আছাফুর রহমান।
সেমিনার প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডাঃ ইব্রাহিম হাওলাদার। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ইউনিয়ন পরিষদ সচিব মো. নাসির উদ্দিন। এসময় উপস্থিত ছিলেন টিএসবি ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক আহবায়ক খান আনোয়ার হোসেন, প্রধান শিক্ষক শাবানা, ইউপি সদস্য শফিকুল ইসলাম বাবু, ইনতাজ মোল্যা, হোসনেয়ারা পারভিন হেনা, নাজমা বেগম, বিএনপি নেতা শিহাবুল সরদার, সাজ্জাত হোসেন, জাহাঙ্গীর হালদার, নজরুল ইসলাম, জাকির শেখ, আকতার শেখ প্রমুখ।
এর পূর্বে তিনি নৈহাটি ইউনিয়ন ভূমি অফিস পরিদর্শন করে দেবীপুর এলাকায় কৃষক কার্ড বিতরণে তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন রূপসা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তরুন কুমার বালা ও অতিরিক্ত কৃষি অফিসার সুজিত মন্ডল।
এছাড়া তিনি রূপসা উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত সরকারি দপ্তরসমূহের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ডি-নথির মাধ্যমে অফিসিয়াল পত্র নিষ্পত্তি সংক্রান্ত প্রশিক্ষণে প্রধান অতিথির বক্তৃতা করেন এবং রূপসা থানা, উপজেলা ভূমি অফিস ও আঠারোবেকী নদীর তীরে অবস্থিত আশ্রয়ন প্রকল্প পরিদর্শন করেন।

