“জন্মিলে মরিতে হবে অমরকে কে কোথায় পাব?”
ক্ষুদ্র এই জীবনে মানুষের অনেক চাওয়া পাওয়াই অপূর্ণ থেকে যায়।এই অপূর্ণতাকে পূর্ণতা এনে দিতে পারে তার কৃত কর্ম।কর্ম গুণে ফল। যে যেমন কর্ম করবে সে তেমন ফল পাবে। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার পর দেশের জনগনের মধ্যেই ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে যায়।স্বাধীনতা ঘোষণাকে কিছু সংখ্যক লোক রাষ্ট্রদ্রোহিতা মনে করে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের সাথে জাতীয় বেইমানের কাজ করে আজও জাতীর কাছে ঘৃণিত ও লাঞ্চিত হচ্ছে। মৃত্যুর পরে আজও তাদের পরিবার ও পরিবারের সদস্যরা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে হেয় প্রতিপন্ন। হয়তো যত দিন পদ্মা,মেঘনা, যমুনা বহমান রবে ততোদিন তাদের পূর্ব পুরুষদের কৃত কর্মের ফল ভোগ করে যেতেই হবে।
দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর সাথে বেইমানির মতো কৃত কর্মের জন্য আজ তাদের এই দুরবস্থা। অপর দিকে দেশের জন্য যারা নিজের জীবন বাজী রেখেছিল তারা মৃত্যুর পরে শহীদ হয়ে অমর হয়ে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ের মনিকোঠায় অবস্থান করছেন। সঠিক চিন্তা চেতনা শুধু ব্যক্তিকেই অমর করে না, পরবর্তী প্রজন্মকেও উন্নত করে।বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পর মার্চ/৭১ থেকে ডিসেম্বর/ ৭১ পর্যন্ত বাংলাদেশের জনগণকে অনেক বাঁধা বিঘ্ন অতিক্রম করতে হয়েছিল।
১ডিসেম্বর থেকে ৫ ডিসেম্বর তারিখ পর্যন্ত জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক পর্যায়ে পাক বাহিনী বিভিন্ন কুট কৌশল অবলম্বন করে কিন্তু সব কৌশলকে ভেস্তে দিতে তৎকালীন শক্তিধর রাশিয়া বিশাল ভূমিকা রাখে।
৪ ডিসেম্বর মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য লিখিত অনুরোধ জানান। এই স্বীকৃতি প্রমাণ করে যে মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তাল দিনগুলোতে বাংলাদেশের পাশে একমাত্র ভারত সরকারই পরম বন্ধুর মত পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। সেদিন ভারতের লোকসভায় দাঁড়িয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেন, ‘স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে বিশাল বাধার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণের সংগ্রাম এক নতুন অধ্যায় রচনা করেছে। সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করার পর ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’ সেদিন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে জাতির উদ্দেশে এক ভাষণে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম মিত্ররাষ্ট্র ভারতের জওয়ানদের অভিনন্দন জানান।
বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ায় পাকিস্তান ভারতের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। পাক-ভারত যুদ্ধের প্রেক্ষিতে পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশন পূর্ব পাকিস্তানে অনুষ্ঠেয় উপ-নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করে। এ নির্বাচন ৭ ডিসেম্বর থেকে অনুষ্ঠিত হবার কথা ছিল। একাত্তরের এদিন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে পাক-ভারত যুদ্ধ বিরতি সংক্রান্ত মার্কিন প্রস্তাবের ওপর সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্বিতীয় দফা ভেটো দেয়। নিউজউইক বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিস্তারিত নিবন্ধ প্রকাশ করে।
স্বাধীনতা সংগ্রামে ডিসেম্বরের প্রতিটি দিনই ছিল গুরু গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ছিল সোমবার।২৬ মাচ/৭১ থেকে ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত লাখো শহীদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে,দেশের মাবোনের ইজ্জত নষ্ট হয়েছে লাখে লাখে,বুদ্ধিবৃত্তিক পেশায় জড়িতদের সপরিবারে নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে। এভাবে কালে কালে পাকবাহিনীও তার পাপের খাতা ভারী করে ফেলে। পাপ কখনও বাপকে ছাড়ে না।অার তাই পাকীরা যত আঘাত করেছে মুক্তিবাহিনীর মনোবল আরও দ্বিগুণ উজ্জীবিত হয়েছে।
এভাবে দিন-মাস পেরিয়ে ১৯৭১ এর আজকের দিনে বাংলার দামাল ছেলেরা তাদের অপ্রতিরোধ্য সংগ্রাম- মুক্তিযুদ্ধকে চূড়ান্ত বিজয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। দেশের সব জায়গাতেই হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার অদলবদলের প্রতিহত হচ্ছিল। শক্তিশালী প্রতিরোধের মুখে বাধ্য হয়ে পিছু হাটছিল।রাতের পরে যেমন দিন আসে তেমনি বাংলার মেঘাচ্ছন্ন আকাশের মেঘ কেটে সেদিন সত্যি রক্তিম সূর্য হেসেছিল। অপেক্ষা করছিল সেই চির কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতার সূর্য উদয়ের জন্য। আজকের এই দিনে ভারত আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়বাংলাদেশকে। এই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি মুক্তিযুদ্ধকে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায় এবং পাকিস্তানের পরাজয় শুধুমাত্র সময়ের ব্যাপার হয়ে পড়ে। আর এজন্য স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের বিজয় অর্জনের অনন্য ও ঐতিহাসিক দিন আজ।
এই স্বীকৃতি ছিলঅনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।ভারতের এই স্বীকৃতি মুক্তিযুদ্ধের গতিকে সমুদ্রের তুফানের মত বেগবান করেছিল।সম্মূখ যুদ্ধের পাশাপাশি কূটনৈতিক যুদ্ধেও পরাজিত হতে থাকে পাকি হানাদাররা। এর আগে পালাবার পথে তারা রাস্তার ওপরের ব্রিজগুলো ভেঙ্গে দেওয়ার চেষ্টা করে। এদিকে লাকসাম, আখাউড়া, চৌদ্দগ্রাম ও হিলিতে মুক্তিবাহিনী দৃঢ় অবস্থান নেয়। পাকিস্তানি বাহিনী যুদ্ধে কুলিয়ে উঠতে না পেরে পিছু হটে বিকল্প অবস্থান নেয়। রাতে আখাউড়া ও সিলেটের শমসেরনগর যৌথবাহিনীর পূর্ণ অধিকারে আসে। আর এদিনই পাক বাহিনী যশোর ক্যান্টমেন্ট ছেড়ে দিয়ে পলাতে বাধ্য হয় এবং যশোর জেলা হানাদার মুক্ত হয়।
আর এদিনটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য যশোরসহ সারাদেশে বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করা হয়।
//স্বীকৃতি বিশ্বাস, নিজস্ব প্রতিবেদক//
অস্ত্র প্রতিযোগিতা নয় সংকটময় সময়ে শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়ুন: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

