মানুষের জীবনটা স্রোতে ভাসা শ্যাওলা বা শরতের শুভ্র সাদা মেঘের ন্যায় ভেসে চলা নয়। জীবনে আছে উত্থান ও পতন। জীবনটা সুন্দর ফুলের ন্যায় সুসংগঠিত করে তোলা, মানুষের উপকারে আসার মতো যোগ্য করে গড়ে তোলা, মানুষের মাঝে নিজের সুকর্ম দিয়ে চির অমর করে তোলার দ্বায়িত্ব প্রত্যেকের নিজের।
জীবনটা নাটকের রঙ্গ মঞ্চ নয় ঠিকই কিন্তু জীবনের নানা ঘটনার আবহ অনেকাংশেই নাটকের সাথে সম্পৃক্ত। সেখানে আছে সুখ-দুঃখ, হাসিকান্না, জীবন-মৃত্যুর হৃদয় বিদারক দৃশ্য!আছে কৃষক, মুটে মজুর,ধনী-গরিবসহ সমাজের নানা রকমের অসঙ্গতি। কর্মের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে চিরজীবী করে রাখার লক্ষ্যে ও সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতি,ভ্রান্তধারণা ও প্রচলিত কুসংস্কারগুলি নাটকের মাধ্যমে তুলে ধরার এবং সমাজ থেকে বিতাড়িত করার প্রত্যয় নিয়ে ১৯৮৯ সালের ১২অক্টোবরের এক শুভলগ্নে প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ও সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল বেষ্টিত যশোর শহরের প্রাণকেন্দ্রে জন্ম হয় আজকের বিখ্যাত ও করোনা কালীন সময়ের হিরো হিসাবে খ্যাত নাট্যগোষ্ঠী “বিবর্তন”যশোর- এর।
সৃষ্টির শুরু থেকে বিবর্তন যশোর সমাজ পরিবর্তনের প্রত্যয় নিয়ে কাজ শুরু করলেও দেশের বিভিন্ন ক্রান্তিকালে বিশেষকরে ঝড়,বন্যা,জলোচ্ছ্বাস, শৈত্যপ্রবাহসহ বিভিন্ন দূর্যোগ কালীন মুহূর্তে সাধ্যমতো মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন বিবর্তনের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলেই। তারা প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি যেমন পালন করেন তেমনি সামাজিক বিভিন্ন ব্যাধি যেমন- বাল্যবিবাহ,যৌতুক,শিশু পাচার,নারী নির্যাতন, মাদকাসক্তি,জেন্ডার ব্যালান্সসহ সামাজিক কুসংস্কার নির্মূলের জন্য কাজ করেছেন। এমনি সাধারণ মানুষকে রক্তদানে উদ্ধুদ্ধ করতে আয়োজন করেছেন রক্তদানের মতো বৃহৎ কর্মসূচির।

আবার গত বছরের ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী সনাক্তের পর বিভিন্ন সময় যখন লকডাউন চলমান তখনও যথাসাধ্য সামর্থ নিয়ে দেশের মানুষের প্রয়োজনে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন বিবর্তন যশোরের একঝাঁক উদ্যোমী,সাহসী কর্মীবাহিনী।অসহায় হতদরিদ্র মানুষদের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণ করেছেন মাস্ক, উদ্ধুদ্ধ করেছেন করোনার বিধিনিষেধ মেনে চলতে, দিয়েছেন খাদ্য সহায়তা। এমনকি করোনাকালীন সময়ে লকডাউনের কারণে শ্রমিক সংকট দেখা দিলে প্রান্তিক কৃষকের উৎপাদিত ধান কেটে মাড়াই করে ঘরে তুলে দেওয়ার কাজে নির্দ্বিধায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন বিবর্তন যশোরের নির্ভীক কর্মীরা। এবছরও তার ব্যাতয় হয়নি।
বরং এবছর নতুনভাবে আর্বিভূত হয়েছেন করোনা আক্রান্ত রোগীদেরবিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দিতে ও অতি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা উপকরণ অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে। যখন বৈশ্বিক মহামারী করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের আঘাতে সমগ্র বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী যশোর জেলার জনগণ করোনার সংক্রমণে সংক্রমিত হয়ে হাসপাতালে পর্যাপ্ত শয্যা, চিকিৎসক, নার্সের সেবা ও জীবনদায়ী অক্সিজেনের অভাবে জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছেন তখন যে কয়েকটি সংগঠণ বিনামূল্যে অক্সিজেন সেবা নিয়ে যশোরের মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তাদের মধ্যে সর্ব প্রথম যে প্রতিষ্ঠান বা যাদের নাম করতে হয় তারা হচ্ছে নাট্য গোষ্ঠী “বিবর্তন”যশোর বা এর নিবেদন প্রাণ কর্মীগণ ।
বর্তমান সময়ের অতিমারি করোনার বিধ্বংসী থাবার কারণে নাট্যকর্মীদের না আছে মঞ্চ,না মহড়া,না আছে আগুন ঝরানো সংলাপ।তাদের বুকে আছে বিধ্বংসী করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো আগুণ ঝরানো বারুদ। আর তাই রোদবৃষ্টি উপেক্ষা করে দিন-রাত তুচ্ছজ্ঞান করে বিবর্তনের একগুচ্ছ নিবেদিত প্রাণ কর্মী অক্সিজেনের সিলিন্ডার ও খাদ্যসহায়তা নিয়ে ছুটে চলেছেন শহরের বিভিন্ন অলিতে গলিতে,হাসপাতালের বারান্দায়।নাওয়া-খাওয়া ভুলে জীবনের মায়াকে তুচ্ছ করে করোনার বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ন হয়েছেন।তারা চাইছেন করোনা আক্রান্ত প্রতিটি মানষকে তাদের সেবা দিয়ে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে। যা অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে দেশের ইতিহাসের পরতে পরতে।
এবছরের ২৯ জুন থেকে শুরু করে অদ্যাবধি বিবর্তন যশোরের কর্মীরা করোনা রোগীদের অত্যাবশকীয় চিকিৎসা সহায়ক উপকরণ অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে ছুটে চলেছেন দুর্বার গতিতে। শুরুতে ৩/৫ টি সিলিন্ডার নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও সমাজের বিত্তবান ও সাদা মনের মানুষের সহায়তায় তারা এখন ৬০ টি সিলিন্ডার দিয়ে সেবা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন। এই সিলিন্ডার গুলো সাইক্লিক ওয়ার্ডে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সারা যশোর শহরের করোনা রোগীদের অক্সিজেন সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
বিবর্তনের কর্মীরা গত ২৯ জুন-২০২১ থেকে শুরু করে ২৯ জুলাই -২০২১ পর্যন্ত ১৩০ জন করোনা রোগীকে ৩৭২ টি অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহ করছেন। এক একটি অক্সিজেন সিলিন্ডার রিফিল ২০০টাকা,পাইপ ৯০টাকা ও সিলিন্ডার রিফিল করতে যাওয়ার জন্য ইজিবাইক ভাড়া ৩০ টাকা সহ মোট ৩২০ টাকা খরচ হয়। ফলে দেখা যায় ৩০ জুলাই-২০২১ এর পূর্ব পর্যন্ত ৩৭২ টি অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহ করতে মোট ১ লক্ষ ৯ হাজার ৪০ টি খরচ হয়েছে। যা দেশের ভিতর ও দেশের বাইরের বিভিন্ন জনের দেওয়া অনুদান নির্ভর।
বিবর্তন যশোরের অক্সিজেন সেবা নেওয়া ১৩০ জনের মধ্যে ১১৫ জন সুস্থ হয়েছেন, ১০ জন মৃত্যু বরণ করেছেন এবং বর্তমানে এখনও সেবা নিচ্ছেন ৫ জন।
ইদের পরে প্রতিদিন সমগ্র যশোরে নতুন নতুন করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে।যশোর জেনারেল হাসপাতালের করোনা ডেডিকেটেড ইউনিটে আসন সংখ্যারও অধিক লোক ভর্তি থেকে চিকিৎসা সেবা নিচ্ছেন।আবার অন্যদিকে হাসপাতালে পর্যাপ্ত শয্যা,আইসিইউ ও অক্সিজেনের সরবরাহের সীমাবদ্ধতা থাকায় শহরের করোনা আক্রান্ত রোগীর একটি বিরাট অংশ নিজ বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ফলে ঐ সকল রোগীদের যদি হঠাৎ করে অক্সিজেন লেভেল কমতে শুরু করে বা অতিরিক্ত অক্সিজেন স্বল্পতা জনিত কারণে শ্বাসকষ্টে ভুগতে থাকেন তাহলে দেরি না করে ধনী-গরীব নির্বিশেষে সকলেই “বিবর্তন”যশোর নামক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের দ্বারস্থ হচ্ছেন।
বর্তমান সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে যশোর জেলায় যে হারে সাধারণ জনগণ করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন তাতে করে বিবর্তনের এই অক্সিজেনের সেবার পরিধি বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই।
আর তাই দেশ ও দেশের বাইরে অবস্থিত বাংলা ভাষা ভাষী সকল জনগণের প্রতি উদ্বাত্ত্ব আহ্বান, দেশের এই দুঃসময়ে দেশের জনগণের পাশে দাঁড়ান। যশোর বাসীকে করোনার মহামারী থেকে রক্ষা করার জন্য আপনারা সাধ্যমতো সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। বিবর্তন যশোরকে সাহায্য পাঠানোর জন্য যোগাযোগ করুণ-০১৮১৯০৩৯০০০ নওরোজ আলম খান চপল (সভাপতি, বিবর্তন যশোর) ও ০১৭১১০১১২৬৮ দীপংকর বিশ্বাস (সাধারণ সম্পাদক, বিবর্তন যশোর)।
প্রত্যেকের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই সম্ভব অদৃশ্য শক্তিশালী করোনার মতো বিপদজনক ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া।আর তাই পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায় করোনা সংক্রমণ রোধে সচেতনামূলক টীম গঠম করা, মাস্ক ব্যবহার,টীকা নিবন্ধন ও টীকা গ্রহনের জন্য সকলকে উদ্ধুদ্ধ করা। ভয় নয়, করোনা সম্পর্কে সচেতনাতেই জয়। এজয় অবশ্যাম্ভী!
//স্বীকৃতি বিশ্বাস, যশোর//
গজারিয়ায় ব্যাক্তি মালিকানা গাছ কাটায় সাংবাদিক পরিচয়ে চাঁদা দাবী, থানায় অভিযোগ

