যশোরের জলাবদ্ধ এলাকায় মৃতের সৎকার নিয়ে দেখা দিয়েছে মহাবিড়ম্বনা

যশোরের জলাবদ্ধ এলাকায় মৃতের সৎকার নিয়ে দেখা দিয়েছে মহাবিড়ম্বনা

 

যশোর জেলার যশোর সদরের একাংশ, অভয়নগর, মনিরামপুর, কেশবপুরের বৃহদাংশ এবং খুলনা জেলার ফুলতলা ও ডুমুরিয়ার কিছু এলাকা নিয়ে ভবদহ এলাকা।অত্র এলাকার ২৭ টি বিলের পানি উঠানামা করার জন্য ষাটের দশকে অভয়নগরের ভবদহ নামক স্থানে তৈরি হয় স্লুইসগেট। নদীর উপর তৈরীকৃত স্লুইসগেটের কারণে নদীর স্বাভাবিক জোয়ারভাটা বাঁধাগ্রস্থ হওয়ায় আশির দশক থেকে নদীতে পলিপড়া শুরু করে।ফলে শ্রী,হরি,টেকাসহ সকল নদীতে পলিজমে নদীগুলো ভরাট হয়ে যায় এবং শুরু হয় স্থায়ী জলাবদ্ধতা।

গত কয়েকদশক ধরে ভবদহ এলাকায় স্থায়ী জলাবদ্ধতায় আক্রান্ত হয়ে আসছে এবং এবছরও তার ব্যাতয় ঘটেনি।গত সেপ্টেম্বর -২০২১ মাসের কয়েকদিনের অতিবৃষ্টির জন্য অভয়নগর, মনিরামপুর, কেশবপুর, ফুলতলা ও ডুমুরিয়া উপজেলার ২৭ টি বিলের পানি প্লাবিত হয়ে ৮০ টি গ্রামের ৩ লক্ষাধিক লোক স্থায়ীভাবে পানিবন্ধী বসবাস করছেন। বদ্ধপানি বাড়ি-ঘর,রাস্তা-ঘাট,স্কুল-কলেজ,মসজিদ-মন্দিরে অবস্থান করায় উক্ত এলাকায় বসবাস যেমন অনুপযোগী হয়েছে তেমনি স্কুল কলেজে, মন্দির- মসজিদে পানি থাকায় শিক্ষা কার্যক্রম চালানো ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালনওঅসম্ভব হয়ে পড়েছে ।

সবচেয়ে বেশি বিপদ হচ্ছে কেউ নিকট আত্মীয় কেউ মারা গেলে। চারিদিকে কোথাও হাঁটু কোথাও কোমর সমান পানি থাকায় মৃতের দাফন-কাফন করার জন্য পাওয়া যাচ্ছে না কোন কবরস্থান, শশ্মান বা সমাধি ক্ষেত্র। বাড়ির পাশের কবরস্থান,সমাধি ক্ষেত্রে হাঁটু বা কোমর সমান পানি থাকায় মৃতের সৎকার নিয়ে দেখা দিয়েছে মহাবিপদ ফলে মৃতের স্বজনদের ভিতর বিরাজ করছে চাঁপা ক্ষোভ ও কান্না।কারণ হিন্দু মুসলিম উভয়কেরমৃত মানুষ দাফন করার জন্য পারিবারিক গোরস্থান ও সমাধিক্ষেত্র বাড়ি থেকে কয়েক মাইল দূরে। প্রথমে উঁচু জায়গা খুঁজে বের করা তারপর আত্মীয় স্বজন,পাড়াপ্রতিবেশীদের দাফন সুসম্পন্ন। একটা দীর্ঘসূত্রিতা!ফলে মৃত মানুষকে নিয়ে করতে হচ্ছে অনাঙ্খিত টানা হেচড়া।মৃত্যুর পর মৃতের প্রাপ্ত সম্মান টুকু দিতে পড়তে হচ্ছে নানা ধরনের জটিলতায়।

আজ ২২ অক্টোবর-২০২১ রোজ শুক্রবার যশোর জেলার মনিরামপুর উপজেলার ১৫ নং কুলটিয়া ইউনিয়নের হাটগাছা গ্রামের প্রাক্তন মেম্বর খোকন মন্ডলের পিতা কালীপদ মন্ডল (৯০) মৃত্যু বরণ করেন। মৃতকালে তিনি পুত্র,নাতিনাতনিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।কিন্তু মৃত ব্যক্তিকে দাফন করার জন্য উপরে উল্লেখিত সমস্যাগুলোর সম্মুখীন হয়ে নিকট আত্মীয়রা হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছেন মৃতের বিড়ম্বনা।

মৃত ব্যক্তির নাতি মনিরামপুর উপজেলার ভবানীপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হীরকজ্যোতি বলেন,আমার ঠাকুরদা,আমার চোখে দেখা একজন সহজ, সরল, সত্যবাদী, ঝুঁকি-ঝামেলামুক্র পরিচ্ছন্ন মানুষ।

স্বাভাবিকভাবেই তিনি বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যুর কাছে সমর্পণ করলেন। কষ্ট একটাই- মিথ্যে আশ্বাস নিয়ে পরপারে চলে গেলেন। তিনিও মিথ্যে প্রতিশ্রুতিতে আশ্বস্ত ছিলেন, ভবদহ এলাকার জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হবে। কিন্তু তিনি দেখে যেতে পারলেন ভবদহ এলাকার স্থায়ী জলাবদ্ধতার সমাধান।ফলে অনেকটা মনকষ্ট নিয়েই চলে যেত হলো এই সুন্দর পৃথিবী থেকে।

তিনি আরও বলেন,ধারে-কাছে এতো বেশি বসতভিটার মালিক আর কেউ ছিলেন বা আছেন কিনা জানিনা। অথচ মৃত্যুর পর উনাকে সমাহিত করার মতো উঁচু জায়গা বাড়ির আশেপাশে কোথাও শুকনো নেই। ফলে বাড়ি থেকে প্রথমে নৌকায় করে তারপর কাঁধে করে ২ কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করে হেলারঘাট নামক স্থানে সৎকার করতে হচ্ছে। শুধু কি তাই মৃতের দাফনের জন্য শুকনো কাঠও সংগ্রহ করতে হচ্ছে চড়াদামে। এরপরে আরও আছে অন্তেষ্টিক্রিয়ার ঝামেলা। এটাই যেন ভবদহ এলাকার জলভাসী মানুষের ভবিতব্য ও বাস্তবতা!

//নিজস্ব প্রতিনিধি//

পড়ুন দৈনিক বিশ্ব

পদ্মা ও মেঘনা নামে আরও দুটি বিভাগ হবে: প্রধানমন্ত্রী

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *