বেঙ্গালুরুর ‘রমন রিসার্চ ইনস্টিটিউট (আরআরআই)’-এর অধ্যাপক বিমান নাথ জানাচ্ছেন, ওই চৌম্বক ক্ষেত্র খুব শক্তিশালী হলে ব্ল্যাক হোলের খুবই মুশকিল হত। খাবার পেত না একেবারেই। কারণ গ্যালাক্সির চার দিক থেকে গ্যাসের ঘন মেঘ, তারা, পদার্থ ব্ল্যাক হোলের জোরালো অভিকর্ষ বলের টানে কাছাকাছি এসেও শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের জালে আটকে যেত। সেই জাল ফুঁড়ে তারা আর ইভেন্ট হরাইজ্নে গিয়ে পৌঁছত না। তাদের আর গোগ্রাসে খাওয়া সম্ভবও হত না ব্ল্যাক হোলের। সেই চৌম্বক ক্ষেত্র খুব দুর্বল হলে ব্ল্যাক হোলের সর্বগ্রাসী ক্ষুধা থেকে কাছেপিঠে এসে পড়া তারা, গ্যাসের ঘন মেঘ, পদার্থের সামান্য রেহাই মেলারও অবকাশ থাকত না। কাছেপিঠে আসা সব কিছুই ব্ল্যাক হোলের পেটে চলে যেত।
বিমান বলছেন, ‘‘ছবি দেখে মনে হচ্ছে এই চৌম্বক ক্ষেত্রের শক্তি মাঝারি মানের। তাই কাছেপিঠে আসা গ্যাসের ঘন মেঘ, তারা, পদার্থের গতিশক্তি বেশি হলে তা চৌম্বক ক্ষেত্রের শক্তিকে অগ্রাহ্য করে ব্ল্যাক হোলের জোরালো অভিকর্ষ বলের টানে তার ইভেন্ট হরাইজ্নের দিকে এগিয়ে যায়। সঙ্গে নিয়ে যায় চৌম্বক ক্ষেত্রেরও কিছু অংশ। ব্ল্যাক হোলের খিদে মেটায়। আর কাছেপিঠে আসা গ্যাসের ঘন মেঘ, তারা, পদার্থের গতিশক্তি কম হলে, তা চৌম্বক ক্ষেত্রের শক্তিকে অগ্রাহ্য করতে পারে না। চৌম্বক ক্ষেত্রের জালে জড়িয়ে যায়। পরে তাদের ছিটকে বার করে দেয় চৌম্বক ক্ষেত্র। তখনই আলোর রেডিও তরঙ্গ, অবলোহিত তরঙ্গ, দৃশ্যমান তরঙ্গ, অতিবেগুনি রশ্মি, এক্স-রে এবং গামা রে বেরিয়ে আসে। একটা ‘জেট’ তৈরি হয়।’’
ব্ল্যাক হোলকে জানার পথ খুলে গেল
নৈনিতালের ‘আর্যভট্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর অবজারভেশনাল সায়েন্সেস (এরিস)’-এর অধ্যাপক ইন্দ্রনীল চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, ‘‘কেন ওই ‘জেট’গুলি বেরিয়ে আসে ব্ল্যাক হোলের আশপাশের এলাকা থেকে, কোথায় তাদের উৎপত্তি হয় ব্ল্যাক হোলের চার পাশের চৌম্বক ক্ষেত্রের ছবি এ বার তা বুঝতে সাহায্য করবে। সেই চৌম্বক ক্ষেত্রের শক্তিকে অগ্রাহ্য করে ন্যূনতম কোন গতিবেগে কাছেপিঠে আসা গ্যাসের ঘন মেঘ, তারা, পদার্থ ব্ল্যাক হোলের ইভেন্ট হরাইজ্নের দিকে ছুটে যায় এ বার সেটা বোঝারও পথ খুলে যেতে পারে।’’
কী ভাবে তৈরি হয় এই চৌম্বক ক্ষেত্র?
ইন্দ্রনীল জানাচ্ছেন, ব্ল্যাক হোলের জোরালো অভিকর্ষ বলের টানে গ্যাসের ঘন মেঘ, তারা, পদার্থ কাছেপিঠে এসে পড়লে তাদের তাপমাত্রা এতটাই বেড়ে যায় যে তারা আর অণু, পরমাণু হয়ে থাকতে পারে না। ইলেকট্রন খুইয়ে তারা আয়ন হয়ে পড়ে। ভেঙে পড়ে রাশি রাশি ইলেকট্রন, প্রোটনের মতো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণায়। তাদের গতিবেগ থাকে বলে তাদের চলার পথে তৈরি হয় বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র। যার পরিণতিতে তৈরি হয় চৌম্বক ক্ষেত্রও।
চৌম্বক ক্ষেত্রের সীমানার শেষটা কোথায়?
ইন্দ্রনীল জানাচ্ছেন, এই ছবি থেকে সেটা বোঝা সম্ভব হয়নি। এ বার হয়তো সেই গবেষণা শুরু হবে। চৌম্বক ক্ষেত্রের সীমানা ব্ল্যাক হোলের কতটা কাছাকাছি পৌঁছতে পারে, সেটা জানাও খুব জরুরি। কারণ, চৌম্বক ক্ষেত্র আবদ্ধ হয় বলে তা যদি ব্ল্যাক হোলে ঢুকে পড়ে তা হলে তাকে বেরিয়েও আসতে হবে। কিন্তু ব্ল্যাক হোল থেকে তো কোনও কিছুর বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। তার মানে, এই চৌম্বক ক্ষেত্রের সীমানা ইভেন্ট হরাইজ্নের আগেই শেষ হয়ে যেতে পারে।
এই যুগান্তকারী ঘটনা ব্ল্যাক হোলের অতলান্ত অন্ধকারের গোপন দরজাটা অনেকটাই খুলে দিল, বলছেন বিমান ও ইন্দ্রনীল।
ছবি সৌজন্যে- ইভেন্ট হরাইজ্ন টেলিস্কোপ।