প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পে ইউএনও’র তত্বাবধানে থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারমূলক জনগুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়ণ প্রকল্পের অধীনে ভূমিহীনদের জন্য ঘর নির্মাণ প্রকল্পেও ভয়াবহ দুর্নীতির থাবা আঘাত হেনেছে। তাও আবার সংশ্লিষ্ট উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সরাসরি এই অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত। তিনি এ সংক্রান্ত সরকার নির্ধারিত কমিটির ধার ধারেননি। ২১৭টি ঘর নির্মাণ প্রকল্পে নিজস্ব রাজমিস্ত্রি নিয়োগ দেওয়াসহ সব কেনাকাটা একাই করেছেন। বিধিবহির্ভূতভাবে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে কোনো কিছু অবহিত না করে ব্যাংক লেনদেনও করেছেন নিজেই। আবার কাজ শেষ না করেই তুলে নিয়েছেন পুরো বিল। ঘটনাটি ঘটেছে সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলায়। অভিযুক্ত কর্মকর্তার নাম মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি প্রশাসন ক্যাডারের ২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা। উপসচিব পদমর্যাদার এ কর্মকর্তা বর্তমানে বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত।
সাবেক ইউএনও শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে আনীত বেশকিছু গুরুতর অভিযোগ তদন্তে গত জানুয়ারিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বিভাগীয় মামলা দায়ের করে। এরপর ১৮ জানুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মো. আবুল হাছানাত হুমায়ুন কবীরকে তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। কমিটি ২৭ জানুয়ারি তদন্তকাজ শুরু করে ২০ জুন শেষ করে। ২১ জুন জনপ্রশাসন সচিবের কাছে ১০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। যেখানে অভিযুক্ত উপসচিব শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে সন্দেহাতীতভাবে অসদাচরণ ও দুর্নীতিপরায়ণতার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, শফিকুল ইসলাম ২০১৬ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে ২০১৮ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসাবে কর্মরত ছিলেন। আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর অধীন এলাকার ভূমিহীনদের জন্য ২১৭টি ঘর নির্মাণে সরকার অর্থ বরাদ্দ করে। প্রতিটি ঘর নির্মাণে ১ লাখ টাকা খরচ ধরে প্রকল্পে মোট ব্যয় হয় ২ কোটি ১৭ লাখ।
অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ১১টি অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে রয়েছে-১. আশ্রয়ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করার জন্য উপজেলা পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট কমিটি থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজে লাভবান হওয়ার জন্য ক্ষমতার অপব্যবহার করে এককভাবে কাজটি করেন। এমনকি কাজ তদারকি করার জন্য কমিটির কাউকে সংযুক্ত করেননি। ২. নিকটাত্মীয় পরিচয়ে সৈয়দপুর এলাকার জনৈক হামিদুল হক মিস্ত্রিকে মৌখিকভাবে কাজের ঠিকাদার নিয়োগ করেন। ৩. প্রকল্পের কাজে কাঠ সরবরাহকারী সোহরাব আলীর বকেয়া প্রায় ৩৫ লাখ টাকা পরিশোধ করেননি। ৪. তারা মেম্বার নামে আরও একজন কাঠ সরবরাহকারীর পাওনা ১ লাখ টাকা পরিশোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেননি। ৫. আব্দুস সালাম মিস্ত্রিকে মোট ২৮টি ঘরের কাজ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ১২টি ঘরের মজুরি পরিশোধ করা হলেও বাকি ১৬টি ঘরের মজুরি বাবদ ৮০ হাজার টাকা পরিশোধ করেননি। ৬. কামরুল ইসলাম নামে আরও একজন মিস্ত্রির পাওনা রয়েছে ৫০ হাজার টাকা। ৭. খুঁটির ফর্মা তৈরির মজুরি ও রড সরবরাহ বাবদ ১ লাখ ১১ হাজার টাকা পাওনা রয়েছে নুরুন্নবী সরকার নামে একজন সাব-ঠিকাদারের। ৮. পাওনাদার হিসাবে অভিযোগকারীদের সঙ্গে মৌখিকভাবে কাজের চুক্তি করেন ইউএনওর নিয়োগকৃত ঠিকাদার হামিদুল হক মিস্ত্রি। হামিদুল হক ইউএনওর পূর্বপরিচিত এবং আত্মীয় হওয়ায় পাওনাদাররা বাকিতে মালামাল সরবরাহসহ কাজ করেন। ফলে এর দায়দায়িত্ব ইউএনওর ওপর বর্তায়। ৯. বর্তমান ইউএনও জাহিদ হোসেন যোগ দেওয়ার পর জানতে পারেন বেশকিছু কাজ অসম্পন্ন রয়েছে। ১০টি ঘরের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। ৬৭টি ঘরের কাজও অসম্পন্ন ছিল। কোনোটির দরজা, কোনটির জানালা এবং কোনোটির চালা ছিল না। এসব কাজ বর্তমান ইউএনও সম্পন্ন করেন। এজন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে অভিযুক্ত ইউএনও অর্থ জোগান দিলেও এখনো তার কাছে লক্ষাধিক টাকা পাওনা রয়েছেন বর্তমান ইউএনও। কিন্তু অদ্যাবধি তা পরিশোধ করেননি। ১০. ইউএনওর নিয়োগকৃত আত্মীয় কাম ঠিকাদার হামিদুল হক মিস্ত্রি কাজের একটা পর্যায়ে সাব-কন্ট্রাক্টরদের পাওনা পরিশোধ না করে পালিয়ে যান। কিন্তু এ বিষয়ে ইউএনও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেননি। ১১. প্রকল্পের কাজ সুষ্ঠুভাবে শেষ না হওয়া সত্ত্বেও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রয়াত মোহাম্মদ নাসিমকে দিয়ে তড়িঘড়ি করে প্রকল্পের ঘরগুলো উদ্বোধন করেন। অথচ প্রকল্পের বিপরীতে সমুদয় অর্থ তিনি তুলে নিয়েছেন, যা আর্থিক শৃঙ্খলার লঙ্ঘন।
তদন্ত প্রতিবেদনে সাক্ষ্য বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে, গৃহ নির্মাণের জন্য নির্ধারিত কমিটি থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্ত কর্মকর্তা এককভাবে ঘর নির্মাণ করে নীতিমালা লঙ্ঘন করেছেন। তদন্ত কমিটি গৃহ নির্মাণ কমিটির কার্যবিবরণীর কপি দেখতে চাইলে তিনি তা দেখাতে পারেননি। অফিস সুপার নিজাম উদ্দিন তদন্ত কমিটিকে জানিয়েছেন, অভিযুক্ত কর্মকর্তা কর্মরত থাকাকালীন তিনি এ সংক্রান্ত বরাদ্দের বিষয়ে জানেন না।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের গৃহ নির্মাণ বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য সচিব হচ্ছেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা একেএম শাহ আলম মোল্লা তদন্ত কমিটিকে জানিয়েছেন, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২১৭টি ঘর নির্মাণের বরাদ্দ আসে। কিন্তু ঘর নির্মাণের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না।
তদন্ত কমিটি এ সংক্রান্ত নথিপত্র যাচাই-বাছাই করে দেখতে পায়, বরাদ্দপ্রাপ্ত অর্থ বিলের মাধ্যমে উত্তোলনের জন্য সোনালী ব্যাংক কাজীপুর শাখায় একটি চলতি হিসাব খোলা হয়। হিসাব খোলার সময় অফিস সুপার, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা এবং ইউএনও স্বাক্ষর করলেও পরে টাকা উত্তোলনের সময় উচ্চমান সহকারী নথিটি সরাসরি ইউএনও বরাবর উপস্থাপন করেন এবং তার (ইউএনও) স্বাক্ষরে টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এখানে টাকা উত্তোলনের বিষয়টি তিনি নিজে একাই করেছেন, যা গুরুতর আর্থিক অনিয়মের শামিল।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে বেশ কয়েকজন সাব-ঠিকাদারি ও মিস্ত্রির টাকা পাওনার বিষয়টি সত্য। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট উপজেলার একজন সম্মানিত ব্যক্তি। ফলে তার এমন ভূমিকা খুবই অনভিপ্রেত। তদন্ত কমিটি মনে করে, ইউএনও যদি সংশ্লিষ্ট কমিটিকে যথাযথভাবে এ কাজে সম্পৃক্ত করতেন, তাহলে এ ধরনের ত্রুটি-বিচ্যুতি এড়ানো সম্ভব হতো। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উপজেলা পর্যায়ে সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কর্মকর্তা। তাই তার কোনো অনৈতিক কাজের কারণে উপজেলা প্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তিনি কমিটিকে পাশ কাটিয়ে এককভাবে কাজ করে এবং নিরীহ শ্রমিকদের টাকা পরিশোধ না করে অন্যায় করেছেন। এছাড়া তিনি এককভাবে কাজ করে সরকারের আর্থিক শৃঙ্খলা ও নীতি লঙ্ঘন করেছেন।
সূত্র জানায়, বিভাগীয় মামলার তদন্ত রিপোর্ট পর্যালোচনা করে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের সর্বোচ্চ প্রতিনিধি হিসাবে এখন বিষয়টি নিষ্পত্তি করবেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কেএম আলী আজম। অর্থাৎ তিনি সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে শাস্তি বা দণ্ডের পরিমাণ নির্ধারণ করবেন। সূত্র: যুগান্তর
//দৈনিক বিশ্ব অনলাইন ডেস্ক//
পড়ুন দৈনিক বিশ্ব …
বাঁশখালীতে প্রিয় শেখেরখীল ব্লাড ব্যাংকের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি
Like this:
Like Loading...